দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ফেসবুকের প্রেমে চীন থেকে কিশোরগঞ্জের হাওরে, তরুণ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখতে ভিড়

কিশোরগঞ্জের হাওরঘেরা এক প্রত্যন্ত গ্রামে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমিকার টানে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন এক তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা। ফেসবুক ও চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করায় স্থানীয়দের মাঝেও তৈরি হয়েছে আলোচনার ঝড়।ঘटनাটি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কিষ্টপুর গ্রামের মোড়লপাড়ার। শনিবার রাতে চীনের হেনান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে এসে সরাসরি প্রেমিকার বাড়িতে পৌঁছান গাও ওয়েইয়ান নামের ওই তরুণ। এরপর থেকেই হাওরপাড়ের শান্ত গ্রামটি যেন একদিনে পরিণত হয়েছে দর্শনার্থীদের ভিড়ের কেন্দ্রে।দুই বছরের অনলাইন পরিচয় থেকে ভালোবাসাস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে একটি অনলাইন চ্যাটিং প্ল্যাটফর্মে পরিচয় হয় গাও ওয়েইয়ান ও ঝুমা আক্তারের। শুরুতে সাধারণ বন্ধুত্ব থাকলেও সময়ের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথন তাঁদের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দূরত্ব—সব বাধা পেরিয়ে একসময় দুজনেই ভবিষ্যৎ একসঙ্গে গড়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1343]ঝুমা আক্তার কিষ্টপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা মো. নজরুল ইসলাম ও মা পাখি আক্তার। স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর বর্তমানে তিনি চৌগাংগা পুরান বাজার কামিল মাদ্রাসায় প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জন্মসনদ অনুযায়ী তাঁর বয়স ১৮ বছরের বেশি।অন্যদিকে গাও ওয়েইয়ান জানান, তিনি চীনের শিনশিয়াং শহরের মুয়ে এলাকার বাসিন্দা এবং সেখানে সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন বলে জানান।হাওরপাড়ে ‘বিদেশি অতিথি’কে ঘিরে উৎসবের আবহরোববার সকাল থেকে কিষ্টপুর গ্রামে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। গ্রামের অনেকেই প্রথমবারের মতো এত কাছ থেকে একজন চীনা নাগরিককে দেখছেন। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ আবার কৌতূহল নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এমন ঘটনা আগে কখনও দেখেননি তাঁরা। প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলের একটি গ্রামে বিদেশি নাগরিক এসে প্রেমিকার বাড়িতে অবস্থান করছেন—এটি এলাকায় নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।গ্রামের এক বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম বলেন, “এত দূর থেকে একজন মানুষ ভালোবাসার টানে এসেছে, এটা সত্যিই অবাক করার মতো। তবে আমরা চাই সবকিছু যেন আইন মেনে হয়। মেয়েটির ভবিষ্যৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”আরেক বাসিন্দা বলেন, “সকাল থেকেই আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছে। অনেকে শুধু এক নজর দেখতেই এসেছে। পুরো গ্রামে উৎসবের মতো পরিবেশ।”ভাষার দূরত্ব থাকলেও বোঝাপড়ায় সমস্যা হয়নিপরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গাও ওয়েইয়ান খুব শান্ত স্বভাবের এবং গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও ভাষাগত সমস্যার কারণে সরাসরি কথোপকথনে কিছুটা জটিলতা হচ্ছে, তবুও অনুবাদ অ্যাপ ও ইশারার মাধ্যমে সবাই যোগাযোগ করছেন।স্থানীয়দের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলা ও সৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তিনি দ্রুতই গ্রামের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। গ্রামের শিশুরাও তাঁকে ঘিরে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে।[TECHTARANGA-POST:1349]একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “এত মানুষ ভিড় করলেও তিনি বিরক্ত হননি। বরং সবাইকে হাসিমুখে গ্রহণ করছেন।”প্রশাসনের নজরেও বিষয়টিভিনদেশি নাগরিকের আগমনের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরেও এসেছে। ইটনা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখেছে এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে তরুণী প্রাপ্তবয়স্ক বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে।ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমরা খোঁজ নিয়েছি। যেহেতু একজন বিদেশি নাগরিক এখানে এসেছেন, তাই আইনগত ও প্রশাসনিক দিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া মেনে যেকোনো সহায়তা দেওয়া হবে।”তবে বিয়ের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। স্থানীয়ভাবে আলোচনা থাকলেও পরিবার কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করা হয়নি।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনাএই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে ভালোবাসার শক্তি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ অনলাইন সম্পর্কের নিরাপত্তা ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির কারণে এখন ভৌগোলিক দূরত্ব আগের মতো বড় বাধা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সহজেই যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে আন্তদেশীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, যদি সম্পর্কটি সত্যিই পারস্পরিক সম্মান ও সম্মতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে আইন মেনে তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। আবার অনেকে মনে করছেন, এমন ঘটনায় তরুণ-তরুণীদের আবেগের পাশাপাশি বাস্তব দিকও বিবেচনা করা জরুরি।এখন কী হতে পারেবর্তমানে গাও ওয়েইয়ান কিষ্টপুর গ্রামেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করা হতে পারে। একই সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।[TECHTARANGA-POST:1257]এদিকে গ্রামের মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি। অনেকে এটিকে ‘হাওরের প্রেমের গল্প’ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। ভালোবাসার টানে হাজার মাইল দূরের পথ পাড়ি দিয়ে হাওরের গ্রামে এক বিদেশি তরুণের আগমন—ঘটনাটি আপাতত কৌতূহল, আবেগ আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জজুড়ে।

ফেসবুকের প্রেমে চীন থেকে কিশোরগঞ্জের হাওরে, তরুণ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখতে ভিড়