দাম্পত্য কলহের জেরে হত্যা, তিন দিন ঘরে লুকিয়ে রেখে দেহাংশ ফেলার অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে
শরীয়তপুর সদর উপজেলায় দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামীকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর নদীর পাড় ও সড়কের পাশ থেকে মরদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।শুক্রবার রাত ১০টার দিকে শরীয়তপুর সদর উপজেলার আটং বৃক্ষতলা সড়কের পাশ থেকে মাথাসহ মরদেহের একটি অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে স্থানীয়দের সন্দেহের ভিত্তিতে এক নারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার সূত্র বেরিয়ে আসে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।ভাড়া বাসায় মিলল হত্যার সূত্রপুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, নিহত জিয়া সরদার (৪০) শরীয়তপুর সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি চন্দ্রপুর বাজার এলাকায় স্ত্রী আসমা বেগমকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। কয়েক মাস ধরে তাদের সংসারে কলহ চলছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।[TECHTARANGA-POST:1321]অভিযোগ রয়েছে, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও হাতাহাতির এক পর্যায়ে আসমা বেগম লোহার রড দিয়ে জিয়ার মাথায় আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।এরপর মরদেহ গোপন করতে দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা করে প্লাস্টিকের ড্রামে রাখা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে সেগুলো ঘরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।বিভিন্ন স্থানে দেহাংশ ফেলার অভিযোগতদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার দুই দিন পর নড়িয়া উপজেলার পদ্মার পাড়ে মরদেহের হাত-পা ফেলে দেওয়া হয়। পরে শুক্রবার বিকেলে মাথাসহ শরীরের আরও কিছু অংশ বস্তায় ভরে সদর উপজেলার আটং বৃক্ষতলা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি অটোরিকশায় করে বস্তা বহন করতে দেখে প্রথমে তেমন সন্দেহ হয়নি। কিন্তু পরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজনের সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে পালং স্কুলসংলগ্ন একটি বাড়িতে ড্রাম রাখতে গেলে বাড়ির লোকজন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পুলিশে খবর দেন।পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য দেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মরদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়।সম্পর্কের শুরু থেকে দাম্পত্য টানাপোড়েনপুলিশ জানিয়েছে, আসমা বেগমের আগেও একটি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে জিয়া সরদারেরও আগের সংসারে একটি সন্তান আছে।[TECHTARANGA-POST:1284]জানা গেছে, মালয়েশিয়াপ্রবাসী থাকাকালে মোবাইল ফোনে জিয়ার সঙ্গে আসমার পরিচয় হয়। পরে তারা গোপনে বিয়ে করেন। এরপর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে জিয়া তার প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।ছয় মাস ধরে তারা চন্দ্রপুর বাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। সেখানে জিয়া একটি করাতকলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তবে সম্প্রতি সংসারে অশান্তি বাড়ছিল বলে দাবি করেছেন প্রতিবেশীরা।এক প্রতিবেশী বলেন, “তাদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ঝগড়া হতো। তবে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে, কেউ কল্পনাও করেনি।”পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তপালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহের অংশ ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।[TECHTARANGA-POST:1290]তিনি বলেন, “অভিযুক্ত নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আদালতে সোপর্দের প্রস্তুতি চলছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”পুলিশ আরও জানায়, ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময়, পদ্ধতি এবং পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে।সমাজে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পারিবারিক সহিংসতাএই ঘটনাটি আবারও পারিবারিক সহিংসতা ও মানসিক অস্থিরতার ভয়াবহ দিক সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপ অনেক সময় চরম সহিংসতায় রূপ নেয়। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসায় সামাজিক ও মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিপজ্জনক দিকে চলে যায়। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের পর মরদেহ গোপনের মতো ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়াচ্ছে।এখন কী অবস্থাশনিবার অভিযুক্ত নারীকে আদালতে তোলা হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া দেহাংশের ডিএনএ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় শরীয়তপুরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক সহায়তা ও সামাজিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি।