ধ্বংসস্তূপ থেকে শিক্ষা: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কী বদলেছে, কী এখনো বাকি
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, সকাল সাড়ে ৮টার কিছু পর। ঢাকার পাশে সাভারের একটি ব্যস্ত এলাকায় হঠাৎ করেই ধসে পড়ে একটি বহুতল ভবন। মুহূর্তেই বদলে যায় হাজারো মানুষের জীবন। Rana Plaza collapse আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়।সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত নয়তলা রানা প্লাজা ভবনটি ছিল মূলত বাণিজ্যিক ব্যবহারযোগ্য একটি স্থাপনা। সেখানে পাঁচটি পোশাক কারখানা, একটি শপিং মল এবং একটি ব্যাংকের শাখা চালু ছিল। ধসের সময় ভবনের ভেতরে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন। ভবনটি ভেঙে পড়ার পর কয়েকদিন ধরে চলে উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ থেকে ১,১৩৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, আর জীবিত উদ্ধার করা হয় ২,৪৩৮ জনকে। এদের মধ্যে প্রায় দুই হাজার মানুষ গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান।নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এলেও সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১,১৩৫ থেকে ১,১৩৮ জনের মধ্যে। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।তদন্তে উঠে আসে ভয়ংকর সব অনিয়মের চিত্র। ভবনটির অনুমোদন ছিল পাঁচ থেকে ছয় তলা পর্যন্ত, কিন্তু মালিক সোহেল রানা বেআইনিভাবে আরও কয়েকটি তলা নির্মাণ করেন। নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল একটি ভরাট করা জলাভূমির ওপর, যা বহুতল ভবনের জন্য মোটেই উপযুক্ত ছিল না।ধসের আগের দিন, অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দেয়। একজন প্রকৌশলী ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেন। তবুও কারখানার মালিক ও কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করে। পরদিন সকালে জেনারেটর চালু করার পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে। অনেকের মতে, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা আর লোভের ফল।ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। সবচেয়ে গুরুতর মামলা ছিল হত্যার অভিযোগে, যেখানে ভবন মালিকসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়। তবে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া এখনো ধীরগতিতে চলছে। শত শত সাক্ষীর মধ্যে অল্প কয়েকজনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। অনেক আসামি এখনো জামিনে বা পলাতক রয়েছেন।ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও ছিল জটিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার উদ্যোগে একটি তহবিল গঠন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল প্রায় ৩ কোটি ডলার সংগ্রহ করা। প্রায় ২৯টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এতে অংশ নেয়। প্রায় ৩,০০০ ভুক্তভোগীকে এই তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়। তবে অনেকের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট ছিল না এবং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল।এই ট্র্যাজেডির পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। ‘অ্যাকর্ড’ এবং ‘অ্যালায়েন্স’ নামে দুটি সংস্থা তৈরি হয়, যারা কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। তারা প্রায় ২,০০০ কারখানা পরিদর্শন করে ঝুঁকি চিহ্নিত করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮১ শতাংশ ঝুঁকি কমানোর কাজ শেষ হয়েছে এবং লাখ লাখ শ্রমিককে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।পটভূমি হিসেবে জানা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশই নারী। রানা প্লাজার আগে তাজরীন ফ্যাশনসের আগুনসহ আরও কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনে দেয়।তবে অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো অনেক কারখানায় নিরাপত্তা ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।সব মিলিয়ে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি বড় শিক্ষা। এটি দেখিয়েছে, অবহেলা ও অনিয়মের মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে। এক যুগ পরও নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার ও পূর্ণ ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায়। এই ঘটনার স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।