চট্টগ্রামের আলোচিত মিতু হত্যা: ভোলা ওরফে এহতেশামুলের জামিনে ব্রেক
চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় আসামি এহতেশামুল হক ওরফে ভোলার জামিন স্থগিত করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। সোমবার (২৭ এপ্রিল) এই আদেশ দেন আদালত। এতে করে মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে এবং নতুন করে বিচার প্রক্রিয়ার দিকে সবার নজর পড়েছে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত এহতেশামুলের মুক্তির পথ বন্ধ হয়ে গেল। মামলার অগ্রগতি এবং পরবর্তী শুনানির ওপর নির্ভর করছে তার আইনি অবস্থান। আদালতের এই পদক্ষেপকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন, কারণ এটি মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সতর্ক ও গভীরভাবে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
এর আগে বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রামের কল্পলোক আবাসিক মিডিয়া টাওয়ারের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বাকলিয়া থানা পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাকে বিভিন্ন মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এহতেশামুল হক একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে দীর্ঘদিনের। এর আগেও তিনি চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষিকা অঞ্জলী রানী দেবী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি নগরের পাঁচলাইশ থানার তেলিপট্টি এলাকায় নিজ বাসার সামনে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যা সে সময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে ঘটে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। তাকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়। দিনের আলোয় এমন একটি হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
ঘটনার পরপরই বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। প্রথমদিকে মামলাটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা তদন্ত করে। পরে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পিবিআই দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ১২ মে মামলায় বড় ধরনের মোড় আনে। মিতুর বাবা নতুন করে মামলা করেন এবং সেখানে বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করা হয়। মোট আটজনকে আসামি করে দায়ের করা ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই বাংলাদেশের একটি বিশেষ তদন্ত সংস্থা, যারা জটিল ও সংবেদনশীল মামলার তদন্ত করে থাকে। দেশের বড় বড় অপরাধ, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় পিবিআইয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এই মামলাটিও তাদের দীর্ঘ তদন্তের কারণে নতুন দিক পেয়েছে।
চট্টগ্রাম শহর দীর্ঘদিন ধরেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে অপরাধ জগতের নানা ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মিতু হত্যার মতো ঘটনার কারণে নগরীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তাই এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, বরং আইনশৃঙ্খলার ওপর মানুষের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এহতেশামুল হকের জামিন স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত মামলাটিকে আবারও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তের অগ্রগতি কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সবাই। এই মামলার সঠিক বিচার নিশ্চিত হলে তা দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।