কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক উন্নয়ন: চার লেন প্রকল্পে অগ্রগতি, দ্রুত কাজের আশ্বাসে স্বস্তির অপেক্ষায় যাত্রীরা
কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ব্যস্ত মহাসড়কটি প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলের প্রধান পথ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ভাঙাচোরা রাস্তা, যানজট আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি এই রুটকে পরিণত করেছিল এক চরম দুর্ভোগের নাম। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার মাঝে এসেছে নতুন আশার বার্তা—মহাসড়কটির উন্নয়ন কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ককে আধুনিক ও নিরাপদ করতে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব উদ্যোগ শেষ হলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:973]সংসদে সড়ক উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাবুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে সড়কমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, মহাসড়কটির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, প্রশস্তীকরণ এবং নিরাপত্তা উন্নয়ন কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।মন্ত্রী আরও জানান, আগে এই সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার একটি বড় প্রকল্প ছিল, তবে তা বর্তমানে বৈদেশিক অর্থায়নের বাইরে চলে গেছে। এর পরও সরকার বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।তিনি বলেন, “জনগণের যাতায়াত স্বস্তিদায়ক করতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে জরুরি সংস্কার অব্যাহত রয়েছে এবং ধাপে ধাপে উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের বর্তমান অবস্থাপ্রায় ৮২ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ হিসেবে বিবেচিত। এই সড়ক দিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়।তবে দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত, ভাঙাচোরা অবস্থা এবং অনিয়মিত সংস্কার কাজের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে অনেক জায়গায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।এ পরিস্থিতিতে যানজটও নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স, পরিবহন ও জরুরি সেবার যানবাহনও আটকে পড়ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।চলমান উন্নয়ন প্রকল্প ও বাস্তবায়ন অগ্রগতিসরকারি তথ্য অনুযায়ী, সড়কটির বিভিন্ন অংশে ইতোমধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সরাইল পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীতকরণ কার্যক্রম চলমান
এই অংশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন তৈরি করা হচ্ছে
দেবিদ্বার, কংশনগর ও ভিংলাবাড়ী এলাকায় রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ কাজ চলছে
ময়নামতি, কোম্পানিগঞ্জ, ফুলগাছতলা ও কুটিচৌমুহনী এলাকায় প্রায় ১,৮৪৫ মিটার সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে
কুমিল্লা থেকে দেবিদ্বার পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুটে প্রশস্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, এসব প্রকল্পের কিছু অংশ দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং অনুমোদন শেষে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।[TECHTARANGA-POST:970]স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া: স্বস্তির পাশাপাশি সতর্কতামহাসড়ক উন্নয়নের খবর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে, তবে তারা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।একজন পরিবহন চালক বলেন,
“এই রাস্তায় প্রতিদিন গাড়ি চালানো খুব কষ্টকর। গর্ত আর যানজটের কারণে সময় নষ্ট হয়, ঝুঁকিও থাকে। যদি কাজ দ্রুত শেষ হয়, তাহলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হবে।”অন্যদিকে যাত্রীরা বলছেন, ভালো সড়ক হলে শুধু সময়ই নয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে যাবে।এক যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“প্রায়ই দেখা যায় রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হয়ে যায় বা দুর্ঘটনা ঘটে। উন্নয়ন কাজ শেষ হলে এই কষ্ট অনেকটাই কমবে।”সড়ক উন্নয়নের সম্ভাব্য প্রভাববিশ্লেষকদের মতে, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক শুধু একটি আঞ্চলিক রুট নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন।এই সড়কের উন্নয়ন হলে—
চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে
পণ্য পরিবহন দ্রুত ও কম খরচে সম্ভব হবে
ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতে গতি আসবে
পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে
দুর্ঘটনা ও যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নির্মাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে সমস্যাগুলো আবারও ফিরে আসতে পারে।প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিং জরুরি।সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা চূড়ান্ত নকশা প্রস্তুতের কাজ করছে। নকশা চূড়ান্ত হলে কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জানা গেছে, উন্নয়ন কাজ ত্বরান্বিত করতে নিয়মিত তদারকি চলছে।যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা সমস্যাবর্তমানে এই মহাসড়কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সংকীর্ণ রাস্তা এবং ভারী যানবাহনের চাপের কারণে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে ছোট দুর্ঘটনাও বড় সমস্যায় রূপ নেয়। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।উপসংহারদীর্ঘদিনের ভোগান্তি আর অব্যবস্থাপনার পর কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী চলমান কাজগুলো দ্রুত শেষ হলে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে যাত্রা হবে আরও নিরাপদ, দ্রুত এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়।
তবে বাস্তব পরিবর্তন কত দ্রুত আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—কথা নয়, কার্যকর পরিবর্তন।