ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানানোর প্রতিশ্রুতি আবারও তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার”—এই নীতিতেই এগোতে চায় বর্তমান সরকার।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে—এটাই সরকারের মূল নীতি।
তিনি বলেন, “আমরা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাই না, অতীতেও করিনি।” তার এই বক্তব্য দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের কখনো সংখ্যালঘু মনে না করতে। তার ভাষায়, “রাষ্ট্র আমাদের সবার, আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক পরিচয়কে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক বৌদ্ধ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। আমরা চাই এই কথাগুলো বাস্তবায়ন হোক মাঠপর্যায়ে।”
সরকারের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এই দর্শনই দেশের সব ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীগত মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতে বহুবার প্রমাণ হয়েছে—এই আদর্শই জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দর্শনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “জাতীয়তাবাদের ধারণা সবসময়ই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে যদি এটি অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের সময় ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা ছিল না।
“মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই মিলে এই দেশ স্বাধীন করেছে,”—বলেন তিনি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশের ইতিহাসে ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেন এবং বর্তমান প্রজন্মকে সেই চেতনা ধরে রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন, দীপেন দেওয়ান এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠান শেষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট এবং গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতি উপহার দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
একজন সমাজকর্মী বলেন, “নীতিগত বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা গুজব দ্রুত মোকাবিলা করতে হবে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
তবে সরকারের এই অবস্থান নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ বা সমালোচনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলনও বটে।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারই সামনে এসেছে—যেখানে ধর্ম নয়, নাগরিক অধিকারই হবে মূল ভিত্তি।
বিষয় : প্রধানমন্ত্রীর সমঅধিকারই পূর্ণিমায়

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানানোর প্রতিশ্রুতি আবারও তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার”—এই নীতিতেই এগোতে চায় বর্তমান সরকার।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে—এটাই সরকারের মূল নীতি।
তিনি বলেন, “আমরা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাই না, অতীতেও করিনি।” তার এই বক্তব্য দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের কখনো সংখ্যালঘু মনে না করতে। তার ভাষায়, “রাষ্ট্র আমাদের সবার, আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক পরিচয়কে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক বৌদ্ধ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। আমরা চাই এই কথাগুলো বাস্তবায়ন হোক মাঠপর্যায়ে।”
সরকারের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এই দর্শনই দেশের সব ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীগত মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতে বহুবার প্রমাণ হয়েছে—এই আদর্শই জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দর্শনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “জাতীয়তাবাদের ধারণা সবসময়ই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে যদি এটি অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের সময় ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা ছিল না।
“মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই মিলে এই দেশ স্বাধীন করেছে,”—বলেন তিনি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশের ইতিহাসে ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেন এবং বর্তমান প্রজন্মকে সেই চেতনা ধরে রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন, দীপেন দেওয়ান এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠান শেষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট এবং গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতি উপহার দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
একজন সমাজকর্মী বলেন, “নীতিগত বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা গুজব দ্রুত মোকাবিলা করতে হবে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
তবে সরকারের এই অবস্থান নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ বা সমালোচনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলনও বটে।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারই সামনে এসেছে—যেখানে ধর্ম নয়, নাগরিক অধিকারই হবে মূল ভিত্তি।

আপনার মতামত লিখুন