দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

উত্তরায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সাংবাদিক নিহত, বাসচালক পলাতক

উত্তরায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সাংবাদিক নিহত, বাসচালক পলাতক

চাচা-ভাতিজির অনৈতিক সম্পর্কে ভাতিজির বিবাহ বিচ্ছেদ, এলাকায় তোলপাড়

নূরুল আনোয়ার ওয়াকফ স্টেটের সম্পত্তি দখল ও অনিয়মের অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্য

কটিয়াদীতে কৃষক হত্যা: ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামি গ্রেফতার, উদ্ধার রক্তমাখা ছুরি

নওগাঁয় বজ্রপাতে নিহতের কবর পাহারা দিচ্ছেন স্বজনরা, লাশ চুরির আশঙ্কায় রাতভর নজরদারি

বাঞ্ছারামপুর থানা হোগলাকান্দি গ্রামে টেকসই সড়ক ও ড্রেন পেয়ে আনন্দিত সর্বস্তরের গ্রামবাসী...

বাঞ্ছারামপুরে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল, নাশকতা প্রতিহতের হুঁশিয়ারি

বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: মেঘালয়ের রেকর্ড বৃষ্টিতে সিলেট-সুনামগঞ্জসহ ৬ জেলায় প্লাবনের শঙ্কা

নওগাঁর আত্রাইয়ে ঝড়ে গাছ পড়ে অন্তঃসত্ত্বা বেদে পল্লীর গৃহবধূর মৃত্যুে: পরিদর্শনে এসপি তারিকুল ইসলাম

নওগাঁর আত্রাইয়ে ঝড়ে গাছ পড়ে অন্তঃসত্ত্বা বেদে পল্লীর গৃহবধূর মৃত্যুে: পরিদর্শনে এসপি তারিকুল ইসলাম
-ফাইল ফটো

নওগাঁর আত্রাইয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের ভয়াবহতায় একটি গাছ ভেঙে পড়ে প্রাণ গেল এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর। ঘটনার পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বেদে পল্লীর করুণ চিত্র দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

রোববার দিবাগত রাতে আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত একটি যাযাবর বেদে পল্লীতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আরাফাতুন (২০) মুন্সিগঞ্জ জেলার পদ্মা থানার খুঁরিয়া গ্রামের মো. ইয়াসিন আরাফাতের স্ত্রী। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে হঠাৎ শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে পুরো পল্লী এলাকা আতঙ্কে পড়ে যায়। প্রবল বাতাসে একটি বড় ইউক্লিপটাস গাছ উপড়ে গিয়ে পলিথিন দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। তখন ঘরের ভেতরে বালিশে শুয়ে ছিলেন আরাফাতুন। গাছের নিচে চাপা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন।

পল্লীর বাসিন্দারা ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই মৃত্যুতে পুরো বেদে পল্লীতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

ঘটনার খবর পেয়ে সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে যান নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। তিনি পল্লীর ঘরগুলো ঘুরে দেখেন এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে ২৫-৩০টি পরিবার পলিথিনের অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছে দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন।

পরিদর্শনের সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের সঙ্গে গল্প করেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে নাস্তার জন্য অর্থ সহায়তা দেন এবং তাদের জন্য একজন প্রাথমিক শিক্ষকের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

পুলিশ সুপার উপস্থিত বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভাগ্যের পরিবর্তন আপনা-আপনি হয় না, এর জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হয়। আর সেই চেষ্টার মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। আপনারা যেখানেই থাকেন না কেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন। শিক্ষা ছাড়া জীবনের উন্নতি সম্ভব নয়।”

তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং বেদে পল্লীর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর এমন মৃত্যু সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন। এখানে এসে বুঝলাম এই শিশুদের জন্য শিক্ষা কতটা জরুরি। আমরা তাদের পাশে আছি। সমাজের সবাইকে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল করিম জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় পুলিশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বেদে পল্লীর নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়ভাবে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “এই অস্থায়ী বসতিগুলো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা চাই, এই জনগোষ্ঠী নিরাপদ জায়গায় বসবাস করুক এবং সমাজের মূলধারায় ফিরে আসুক।”

বাংলাদেশে বেদে সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। তারা সাধারণত নদীর তীর বা খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থায়ী বসবাস ও শিক্ষার সুযোগ না থাকায় তাদের জীবনযাত্রা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে, কালবৈশাখী ঝড় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। বিশেষ করে যেসব মানুষ দুর্বল ও অস্থায়ী ঘরে বসবাস করেন, তাদের জন্য এই ঝড় অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর দিকে আরও নজর দেওয়ার দাবি উঠেছে।

পুলিশ সুপারের মানবিক উদ্যোগ এবং শিশুদের শিক্ষার প্রতি তার গুরুত্বারোপ স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে পারলে এই বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে পারে।

একদিকে যেমন একটি প্রাণহানির বেদনা, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে পরিবর্তনের আশার আলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে যদি শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তবে সেটিই হবে নিহত আরাফাতুনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

বিষয় : নওগাঁ অন্তঃসত্ত্বা এসপি তারিকুল ইসলাম অন্তঃসত্ত্বা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬


নওগাঁর আত্রাইয়ে ঝড়ে গাছ পড়ে অন্তঃসত্ত্বা বেদে পল্লীর গৃহবধূর মৃত্যুে: পরিদর্শনে এসপি তারিকুল ইসলাম

প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

নওগাঁর আত্রাইয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের ভয়াবহতায় একটি গাছ ভেঙে পড়ে প্রাণ গেল এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর। ঘটনার পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বেদে পল্লীর করুণ চিত্র দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

রোববার দিবাগত রাতে আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত একটি যাযাবর বেদে পল্লীতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আরাফাতুন (২০) মুন্সিগঞ্জ জেলার পদ্মা থানার খুঁরিয়া গ্রামের মো. ইয়াসিন আরাফাতের স্ত্রী। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে হঠাৎ শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে পুরো পল্লী এলাকা আতঙ্কে পড়ে যায়। প্রবল বাতাসে একটি বড় ইউক্লিপটাস গাছ উপড়ে গিয়ে পলিথিন দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। তখন ঘরের ভেতরে বালিশে শুয়ে ছিলেন আরাফাতুন। গাছের নিচে চাপা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন।

পল্লীর বাসিন্দারা ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই মৃত্যুতে পুরো বেদে পল্লীতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

ঘটনার খবর পেয়ে সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে যান নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। তিনি পল্লীর ঘরগুলো ঘুরে দেখেন এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে ২৫-৩০টি পরিবার পলিথিনের অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছে দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন।

পরিদর্শনের সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের সঙ্গে গল্প করেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে নাস্তার জন্য অর্থ সহায়তা দেন এবং তাদের জন্য একজন প্রাথমিক শিক্ষকের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

পুলিশ সুপার উপস্থিত বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভাগ্যের পরিবর্তন আপনা-আপনি হয় না, এর জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হয়। আর সেই চেষ্টার মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। আপনারা যেখানেই থাকেন না কেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন। শিক্ষা ছাড়া জীবনের উন্নতি সম্ভব নয়।”

তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং বেদে পল্লীর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর এমন মৃত্যু সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন। এখানে এসে বুঝলাম এই শিশুদের জন্য শিক্ষা কতটা জরুরি। আমরা তাদের পাশে আছি। সমাজের সবাইকে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল করিম জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় পুলিশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বেদে পল্লীর নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়ভাবে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “এই অস্থায়ী বসতিগুলো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা চাই, এই জনগোষ্ঠী নিরাপদ জায়গায় বসবাস করুক এবং সমাজের মূলধারায় ফিরে আসুক।”

বাংলাদেশে বেদে সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। তারা সাধারণত নদীর তীর বা খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থায়ী বসবাস ও শিক্ষার সুযোগ না থাকায় তাদের জীবনযাত্রা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে, কালবৈশাখী ঝড় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। বিশেষ করে যেসব মানুষ দুর্বল ও অস্থায়ী ঘরে বসবাস করেন, তাদের জন্য এই ঝড় অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর দিকে আরও নজর দেওয়ার দাবি উঠেছে।

পুলিশ সুপারের মানবিক উদ্যোগ এবং শিশুদের শিক্ষার প্রতি তার গুরুত্বারোপ স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে পারলে এই বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে পারে।

একদিকে যেমন একটি প্রাণহানির বেদনা, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে পরিবর্তনের আশার আলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে যদি শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তবে সেটিই হবে নিহত আরাফাতুনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর