আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাকে ঘিরে নতুন তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের দেওয়া বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক—এমন দাবি করেছেন একজন ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট খাতের সাবেক সংগঠনপ্রধান মো. ইমদাদুল হক মোল্লা।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন। মামলাটি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের বিরুদ্ধে।
জবানবন্দিতে ইমদাদুল হক জানান, তিনি অপ্টিমেক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের পরিচালক এবং ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারনেট সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে ওই সময়ের ঘটনাগুলো সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই মহাখালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগে। ওইদিন বিকেল ৪টার দিকে দেশের কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হতে শুরু করে। পরে রাত ৯টার দিকে সারা দেশে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ইমদাদুল হক জানান, ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ ধাপে কাজ করে। এর আগে থাকে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্টোরিয়াল কোম্পানি (আইটিসি)। তারা আইআইজির সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, আইটিসি থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তখনই তারা বুঝতে পারেন এটি কোনো কারিগরি সমস্যা নয়, বরং সরকারের সিদ্ধান্তে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৩ জুলাই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আসেন। সেখানে উপস্থিত ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীরা দ্রুত সেবা চালুর অনুরোধ জানান। তখন পলক জানান, রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু হবে।
কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন যে ডাটা সেন্টারে আগুন লাগার কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এ বক্তব্যকে রাজনৈতিক বলে মনে হয়েছে বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন ইমদাদুল হক। তার ভাষায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগলেও কোনো ডাটা সেন্টারে আগুন লাগেনি। কিছু জায়গায় অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল পুড়ে গেলেও সারা দেশের ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়।
প্রসঙ্গত, দেশে ইন্টারনেট অবকাঠামো সাধারণত একাধিক স্তরে পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরবরাহ, গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ—এই তিন স্তরের সমন্বয়ে পুরো নেটওয়ার্ক সচল থাকে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া সাধারণত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব হয় না বলে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এছাড়া অতীতেও বড় রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দেশে আংশিক বা পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নজির রয়েছে। তবে প্রতিবারই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এই সাক্ষ্য এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। পুরো বিষয়টি নিয়ে জনমনে আগ্রহও বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬
আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাকে ঘিরে নতুন তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের দেওয়া বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক—এমন দাবি করেছেন একজন ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট খাতের সাবেক সংগঠনপ্রধান মো. ইমদাদুল হক মোল্লা।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন। মামলাটি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের বিরুদ্ধে।
জবানবন্দিতে ইমদাদুল হক জানান, তিনি অপ্টিমেক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের পরিচালক এবং ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারনেট সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে ওই সময়ের ঘটনাগুলো সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই মহাখালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগে। ওইদিন বিকেল ৪টার দিকে দেশের কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হতে শুরু করে। পরে রাত ৯টার দিকে সারা দেশে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ইমদাদুল হক জানান, ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ ধাপে কাজ করে। এর আগে থাকে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্টোরিয়াল কোম্পানি (আইটিসি)। তারা আইআইজির সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, আইটিসি থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তখনই তারা বুঝতে পারেন এটি কোনো কারিগরি সমস্যা নয়, বরং সরকারের সিদ্ধান্তে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৩ জুলাই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আসেন। সেখানে উপস্থিত ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীরা দ্রুত সেবা চালুর অনুরোধ জানান। তখন পলক জানান, রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু হবে।
কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন যে ডাটা সেন্টারে আগুন লাগার কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এ বক্তব্যকে রাজনৈতিক বলে মনে হয়েছে বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন ইমদাদুল হক। তার ভাষায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগলেও কোনো ডাটা সেন্টারে আগুন লাগেনি। কিছু জায়গায় অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল পুড়ে গেলেও সারা দেশের ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়।
প্রসঙ্গত, দেশে ইন্টারনেট অবকাঠামো সাধারণত একাধিক স্তরে পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরবরাহ, গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ—এই তিন স্তরের সমন্বয়ে পুরো নেটওয়ার্ক সচল থাকে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া সাধারণত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব হয় না বলে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এছাড়া অতীতেও বড় রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দেশে আংশিক বা পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নজির রয়েছে। তবে প্রতিবারই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এই সাক্ষ্য এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। পুরো বিষয়টি নিয়ে জনমনে আগ্রহও বাড়ছে।

আপনার মতামত লিখুন