বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে বরণ করতে সুর, রঙ আর উৎসবের এক মিলনমেলায় মেতে উঠেছে পুরো দেশ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয়েছে গান, আবৃত্তি আর নানা আয়োজন—যেখানে ঐতিহ্য আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে গেছে।
রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবর-এ ভোর থেকেই জমে ওঠে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান। চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শত শত কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে বাংলা গানের সুর। এখানে অংশ নেন বরেণ্য শিল্পী রফিকুল আলম, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, কিরণ চন্দ্র রায়, কোনাল ও লুইপা। আবৃত্তিতে ছিলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এবং উপস্থাপনায় দীপ্তি চৌধুরী। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত চলা এই আয়োজন যেন ঢাকার মানুষের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
এর আগের সন্ধ্যায় চৈত্রসংক্রান্তির বিদায় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজসহ বিশিষ্টজনরা। এই ধারাবাহিক আয়োজন আসলে বহু বছর ধরে চলে আসছে এবং এটি এখন নগর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অংশ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ঘরে বসেও যেন কেউ উৎসব থেকে বঞ্চিত না হয়—সে জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) দিনভর নানা অনুষ্ঠান প্রচার করছে। রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষ আসর থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য নাচ-গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘চাওয়া পাওয়া’, কবিতা পাঠ এবং রাতের বিশেষ টেলিফিল্ম—সব মিলিয়ে টিভি পর্দাতেও চলছে বৈশাখের আমেজ। এই ধরণের আয়োজন গ্রাম-শহর সব জায়গার মানুষের কাছে উৎসবকে পৌঁছে দেয়।
রাজধানীর বাইরে পাবনা-তেও জমে উঠেছে ‘রুচি বৈশাখী উৎসব ১৪৩৩’। সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত এই কনসার্টে গান পরিবেশন করছেন জনপ্রিয় শিল্পী নগরবাউল জেমস, ইমরান মাহমুদুল ও ঐশী। সঙ্গে রয়েছে নৃত্য পরিবেশনা, যা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
তারুণ্যের উচ্ছ্বাস যোগ করেছে জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট। তারা রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পারফর্ম করছে, যার মধ্যে রয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। তরুণদের অংশগ্রহণে এই কনসার্টগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে বৈশাখকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের আয়োজনে চলছে সংগীত পরিবেশনা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল একসঙ্গে গান গেয়ে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন নিলুফার জাহান চিনু, মানজার চৌধুরী সুইট ও কাজী মিজানুর রহমান।
পহেলা বৈশাখ মূলত বাংলা সনের প্রথম দিন, যার প্রচলন শুরু হয় মুঘল সম্রাট আকবর-এর সময় থেকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এই বাংলা সনের প্রবর্তন হয়েছিল বলে ইতিহাসে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে এটি বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, গান, নাচ, আবৃত্তি আর মানুষের মিলনে এবারের নববর্ষ হয়ে উঠেছে এক আনন্দঘন মিলনমেলা। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই একই সুর, একই আনন্দ। ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বাঙালির এই উৎসব আবারও প্রমাণ করল—সংস্কৃতিই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আপনার মতামত লিখুন