ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন সেক্টরে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রেই উঠে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডারবাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, বিদেশে অর্থ পাচার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং হত্যা মামলায় জড়িত থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আহসান হাবীবকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক অঙ্গনেও।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, মো. আহসান হাবীব ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে যোগ দেন। এরপর থেকেই একের পর এক দরপত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ বা পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করা হতো। এতে বিপুল পরিমাণ কমিশন ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মচারী জানান, “তার নিজস্ব একটি শক্তিশালী বলয় আছে। কোনো প্রকল্প বা দরপত্র তার অনুমতি ছাড়া এগোয় না বলেই অনেকে মনে করেন।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আহসান হাবীবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে শতকোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা দুদকের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে অনেক সময় অভিযুক্তরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যান।
আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থ ও রসদ জোগানের অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত কিছু পক্ষকে নানাভাবে সহায়তা করেছিলেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ ধরনের অভিযোগ সামনে এলেও সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায়ও আসামি করা হয়েছে আহসান হাবীবকে। মামলা নং-৮৭৪’র ৭০ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, কে এম শাহরিয়ার শুভ নামের এক ব্যক্তি গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করেন। পরে আদালত বিষয়টি পল্টন মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং আবেদনটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে পল্টন মডেল থানা থেকে আদালতে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই বিষয়ে আগেই আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, মামলা থেকে নিজের নাম সরিয়ে নিতে বাদীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন আহসান হাবীব। এমনকি টাকার প্রলোভন ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ হলেও তিনি সেগুলো “ম্যানেজ” করে ফেলতেন।
এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের খুব কাছের ছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও খুব একটা অগ্রগতি দেখা যেত না।”
বাংলাদেশে সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা বলছেন, “ম্যানেজ” সংস্কৃতি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। যখন অভিযোগ ওঠার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
সব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে হত্যা মামলায় নাম—এসবের পরও তিনি কীভাবে দায়িত্বে বহাল আছেন, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
তবে আইনের দৃষ্টিতে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তাই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
বিষয় : আহসান হাবীব

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন সেক্টরে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রেই উঠে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডারবাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, বিদেশে অর্থ পাচার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং হত্যা মামলায় জড়িত থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আহসান হাবীবকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক অঙ্গনেও।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, মো. আহসান হাবীব ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে যোগ দেন। এরপর থেকেই একের পর এক দরপত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ বা পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করা হতো। এতে বিপুল পরিমাণ কমিশন ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মচারী জানান, “তার নিজস্ব একটি শক্তিশালী বলয় আছে। কোনো প্রকল্প বা দরপত্র তার অনুমতি ছাড়া এগোয় না বলেই অনেকে মনে করেন।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আহসান হাবীবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে শতকোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা দুদকের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে অনেক সময় অভিযুক্তরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যান।
আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থ ও রসদ জোগানের অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত কিছু পক্ষকে নানাভাবে সহায়তা করেছিলেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ ধরনের অভিযোগ সামনে এলেও সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায়ও আসামি করা হয়েছে আহসান হাবীবকে। মামলা নং-৮৭৪’র ৭০ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, কে এম শাহরিয়ার শুভ নামের এক ব্যক্তি গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করেন। পরে আদালত বিষয়টি পল্টন মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং আবেদনটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে পল্টন মডেল থানা থেকে আদালতে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই বিষয়ে আগেই আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, মামলা থেকে নিজের নাম সরিয়ে নিতে বাদীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন আহসান হাবীব। এমনকি টাকার প্রলোভন ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ হলেও তিনি সেগুলো “ম্যানেজ” করে ফেলতেন।
এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের খুব কাছের ছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও খুব একটা অগ্রগতি দেখা যেত না।”
বাংলাদেশে সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা বলছেন, “ম্যানেজ” সংস্কৃতি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। যখন অভিযোগ ওঠার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
সব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে হত্যা মামলায় নাম—এসবের পরও তিনি কীভাবে দায়িত্বে বহাল আছেন, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
তবে আইনের দৃষ্টিতে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তাই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন