জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের কথা বলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ নীতির লক্ষ্য হলো কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, অন্য কোনো দেশের জনগণ বা সরকারের স্বার্থ বিবেচনার আগে বাংলাদেশ নিজের জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে রাখাই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মূল পার্থক্য।
সরকারের এই কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির বিকাশ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখা হতো।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক বলয়ের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশ একা হয়ে যাওয়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানোই এ নীতির লক্ষ্য।
সরকার ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান তিনি।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সামনে এনেছে সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তির বিকাশ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রয়োজন, উৎপাদনকেন্দ্র প্রয়োজন এবং প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ প্রয়োজন।
তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো অংশীদারত্ব দেশের জন্য কী সুফল বয়ে আনবে, তার ভিত্তিতেই সেটি মূল্যায়ন করা হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ, ব্রিকস, সার্ক ও বিমসটেকের মতো বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক কাঠামোয় অংশগ্রহণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখেন না তিনি। বরং বাংলাদেশের স্বার্থে সহায়ক হলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কথিত অধীনতামূলক প্রবণতা থেকে সরে আসার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগ, আগের সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। তাঁর মতে, কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত না করেই ভারতকে ট্রানজিটসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এ নীতি থাকলেও বাস্তবে আগের সরকার অধীনতামূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
এর বিপরীতে নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সার্বভৌমত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের নীতি হওয়া উচিত—বন্ধু চাই, প্রভু নয়।’
তাঁর মতে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তবে কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরকালে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বাংলাদেশকে সামরিক জোটে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী।
তাঁর মতে, সামরিক জোটের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চুক্তি, বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক অংশীদারত্বের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের ওপরও জোর দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শাকসবজি ও মাছের বিদেশে চাহিদা রয়েছে। ফলে প্রচলিত রপ্তানি খাতের বাইরেও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ আছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর।
তিনি বলেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি, কার্যকর সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবিরের মতে, বাইরের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের সীমিত হলেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন:
জাতীয় শক্তি ও সংহতি জোরদার করা।
বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা।
বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ সামলাতে কূটনৈতিক দক্ষতা বাড়ানো।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে—কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী প্রত্যাশা করে এবং কোন সহযোগিতা দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি সুফল বয়ে আনবে।
আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
তিনি জানান, সার্ককে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকার আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্ক এবং বিমসটেক—দুটি সংস্থাকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখতে চায়।
শামা ওবায়েদের মতে, দুটি সংস্থা পাশাপাশি কাজ করতে পারে এবং তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশের আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথমত, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংহতি, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা না গেলে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের কথা বলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ নীতির লক্ষ্য হলো কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, অন্য কোনো দেশের জনগণ বা সরকারের স্বার্থ বিবেচনার আগে বাংলাদেশ নিজের জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে রাখাই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মূল পার্থক্য।
সরকারের এই কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির বিকাশ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখা হতো।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক বলয়ের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশ একা হয়ে যাওয়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানোই এ নীতির লক্ষ্য।
সরকার ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান তিনি।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সামনে এনেছে সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তির বিকাশ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রয়োজন, উৎপাদনকেন্দ্র প্রয়োজন এবং প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ প্রয়োজন।
তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো অংশীদারত্ব দেশের জন্য কী সুফল বয়ে আনবে, তার ভিত্তিতেই সেটি মূল্যায়ন করা হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ, ব্রিকস, সার্ক ও বিমসটেকের মতো বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক কাঠামোয় অংশগ্রহণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখেন না তিনি। বরং বাংলাদেশের স্বার্থে সহায়ক হলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কথিত অধীনতামূলক প্রবণতা থেকে সরে আসার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগ, আগের সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। তাঁর মতে, কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত না করেই ভারতকে ট্রানজিটসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এ নীতি থাকলেও বাস্তবে আগের সরকার অধীনতামূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
এর বিপরীতে নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সার্বভৌমত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের নীতি হওয়া উচিত—বন্ধু চাই, প্রভু নয়।’
তাঁর মতে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তবে কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরকালে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বাংলাদেশকে সামরিক জোটে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী।
তাঁর মতে, সামরিক জোটের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চুক্তি, বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক অংশীদারত্বের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের ওপরও জোর দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শাকসবজি ও মাছের বিদেশে চাহিদা রয়েছে। ফলে প্রচলিত রপ্তানি খাতের বাইরেও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ আছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর।
তিনি বলেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি, কার্যকর সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবিরের মতে, বাইরের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের সীমিত হলেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন:
জাতীয় শক্তি ও সংহতি জোরদার করা।
বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা।
বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ সামলাতে কূটনৈতিক দক্ষতা বাড়ানো।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে—কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী প্রত্যাশা করে এবং কোন সহযোগিতা দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি সুফল বয়ে আনবে।
আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
তিনি জানান, সার্ককে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকার আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্ক এবং বিমসটেক—দুটি সংস্থাকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখতে চায়।
শামা ওবায়েদের মতে, দুটি সংস্থা পাশাপাশি কাজ করতে পারে এবং তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশের আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথমত, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংহতি, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা না গেলে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন