দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শিগগিরই সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

শিগগিরই সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সাইবার বুলিংয়ের শিকার ১০০ কিশোরীর ৩১ জনের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ

সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, সবার পরিচয় হবে বাংলাদেশি: মাহদী আমিন

সংকুচিত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির বাজার,দুই মাসে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৬.৪৭ শতাংশ

দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টির পূর্বাভাস, কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণ

জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ একাডেমি, পাশে হবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার

১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন, এটিএমে মিলবে নগদ টাকা

নিরাপদ পানির নিশ্চয়তায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত প্রকল্পের পরিকল্পনা

সংকুচিত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির বাজার,দুই মাসে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৬.৪৭ শতাংশ

সংকুচিত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির বাজার,দুই মাসে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৬.৪৭ শতাংশ
ভিসা জটিলতা ও বিদেশে কর্মসংস্থানের নানা বাধায় অনিশ্চয়তায় পড়ছেন বাংলাদেশি কর্মী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে একের পর এক বাধার মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা বাতিলের অভিযোগ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে সাক্ষাৎকার দিতে ভারতে যেতে না পারার কারণে অনেকের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে চাকরি হারানো, নিয়োগের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

জনশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যানেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিবেদনে সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী। আগস্টে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৯২৯ জনে। এক মাসে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন বা ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা আগেও দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ জন কর্মী। এর আগের প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৪। আর আগের বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৯ জন।

অর্থাৎ, এক মাসের পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে একাধিক প্রান্তিকের তথ্যেও বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমার চিত্র উঠে এসেছে।

বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, কর্মীদের আয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বিদেশে কর্মরত সদস্যের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমলেও দেশে প্রবাসী আয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

শুধু আগস্ট মাসেই দেশে এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

তবে প্রবাসী আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ প্রবাসী আয়ের বড় উৎস। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের একটি অংশের অভিযোগ, তাদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সংখ্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ভিসা বাতিলের কারণে অনেকে চাকরি, নিয়মিত আয় ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করে সংসার চালানো এসব মানুষের কারও কারও সঞ্চয়ও শেষ হয়ে আসছে।

চার মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছেন সাইফুল ইসলাম। সেখানে একটি কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁর নিজের গাড়িও ছিল বলে জানান।

সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, পরিচিত কয়েকজনের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার খবর শুনে নিজের ভিসার অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। সেখানে একটি কোম্পানির সুপারভাইজার হিসেবে অনেক ভালো বেতনের চাকরি করতাম। নিজের গাড়ি ছিল। হঠাৎ শুনলাম, কোনো কারণ ছাড়াই অনেকের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হচ্ছে। যাচাই করতে গিয়ে দেখি, আমার ভিসাটিও বাতিল। টিকিটের টাকা লোকসান হয়েছে। জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। এখন সঞ্চয়ও শেষের দিকে।’

সাইফুলের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিদেশে কর্মরত অবস্থায় ভিসার জটিলতা তৈরি হলে শুধু চাকরি নয়, দেশে ফিরে আসার পর কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ইউরোপে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার কার্যক্রমের কিছু অংশ ভারতের দিল্লিসহ অন্যান্য শহরে পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য ভারতে যেতে হয়।

কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মী নির্ধারিত সময়ে সেখানে যেতে পারছেন না বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এতে দূতাবাসের সাক্ষাৎকার, পাসপোর্ট জমা ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণ আটকে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাবর্ষ শুরু ও আবাসনসংক্রান্ত সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মীদের নির্ধারিত সময়ে নিয়োগকর্তার কাছে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন থাকে। সময়মতো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে কারও কারও চাকরির সুযোগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ভিসা আবেদন, কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও যাতায়াতের জন্য ব্যয় করা অর্থও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

রোমানিয়ার একটি কোম্পানি থেকে প্রায় দেড় মাস আগে কাজের অনুমতিপত্র পেয়েছেন শাফিন আহমেদ। কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় রোমানিয়ার দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারছেন না তিনি।

গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করার পর কাজের অনুমতিপত্র পেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

শাফিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত দুই বছর থেকে বহু দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। শেষমেশ রোমানিয়ার একটি কোম্পানির কাজের অনুমতিপত্র পেয়েও ভারতের ভিসা না পাওয়ায় দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা করতে পারছি না। ১২ অক্টোবর রোমানিয়ার দূতাবাসে আমার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল। অথচ এখনো ভারতের ভিসা করাতে পারলাম না।’

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, জীবনের স্বপ্নটা এখানেই থেমে যাচ্ছে।’

শাফিনের মতো আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কাজের অনুমতিপত্র পাওয়ার পরও বিদেশযাত্রা নিশ্চিত না হওয়ায় নিয়োগকর্তার নির্ধারিত সময়সীমা, আর্থিক ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যানে পতনের পাশাপাশি ভিসা ও সাক্ষাৎকারসংক্রান্ত জটিলতা জনশক্তি রপ্তানির বাজারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নির্দিষ্ট দেশে ভিসার অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের দূতাবাসে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য প্রক্রিয়াটি কঠিন হয়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতিতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিদেশে চাকরি বা পড়াশোনার প্রক্রিয়ায় আটকে পড়া আবেদনকারীদের জন্য কার্যকর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে ভিসা বাতিলের অভিযোগ, ভারতে যেতে না পারার কারণে আবেদন আটকে থাকার পরিসর এবং এর ফলে কতজন কর্মী বা শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হবে।

বিষয় : প্রবাসী আয় জনশক্তি রপ্তানি বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


সংকুচিত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির বাজার,দুই মাসে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৬.৪৭ শতাংশ

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে একের পর এক বাধার মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা বাতিলের অভিযোগ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে সাক্ষাৎকার দিতে ভারতে যেতে না পারার কারণে অনেকের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে চাকরি হারানো, নিয়োগের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

জনশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যানেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিবেদনে সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী। আগস্টে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৯২৯ জনে। এক মাসে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন বা ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা আগেও দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ জন কর্মী। এর আগের প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৪। আর আগের বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৯ জন।

অর্থাৎ, এক মাসের পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে একাধিক প্রান্তিকের তথ্যেও বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমার চিত্র উঠে এসেছে।

বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, কর্মীদের আয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বিদেশে কর্মরত সদস্যের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমলেও দেশে প্রবাসী আয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

শুধু আগস্ট মাসেই দেশে এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

তবে প্রবাসী আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ প্রবাসী আয়ের বড় উৎস। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের একটি অংশের অভিযোগ, তাদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সংখ্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ভিসা বাতিলের কারণে অনেকে চাকরি, নিয়মিত আয় ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করে সংসার চালানো এসব মানুষের কারও কারও সঞ্চয়ও শেষ হয়ে আসছে।

চার মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছেন সাইফুল ইসলাম। সেখানে একটি কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁর নিজের গাড়িও ছিল বলে জানান।

সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, পরিচিত কয়েকজনের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার খবর শুনে নিজের ভিসার অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। সেখানে একটি কোম্পানির সুপারভাইজার হিসেবে অনেক ভালো বেতনের চাকরি করতাম। নিজের গাড়ি ছিল। হঠাৎ শুনলাম, কোনো কারণ ছাড়াই অনেকের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হচ্ছে। যাচাই করতে গিয়ে দেখি, আমার ভিসাটিও বাতিল। টিকিটের টাকা লোকসান হয়েছে। জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। এখন সঞ্চয়ও শেষের দিকে।’

সাইফুলের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিদেশে কর্মরত অবস্থায় ভিসার জটিলতা তৈরি হলে শুধু চাকরি নয়, দেশে ফিরে আসার পর কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ইউরোপে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার কার্যক্রমের কিছু অংশ ভারতের দিল্লিসহ অন্যান্য শহরে পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য ভারতে যেতে হয়।

কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মী নির্ধারিত সময়ে সেখানে যেতে পারছেন না বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এতে দূতাবাসের সাক্ষাৎকার, পাসপোর্ট জমা ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণ আটকে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাবর্ষ শুরু ও আবাসনসংক্রান্ত সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মীদের নির্ধারিত সময়ে নিয়োগকর্তার কাছে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন থাকে। সময়মতো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে কারও কারও চাকরির সুযোগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ভিসা আবেদন, কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও যাতায়াতের জন্য ব্যয় করা অর্থও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

রোমানিয়ার একটি কোম্পানি থেকে প্রায় দেড় মাস আগে কাজের অনুমতিপত্র পেয়েছেন শাফিন আহমেদ। কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় রোমানিয়ার দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারছেন না তিনি।

গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করার পর কাজের অনুমতিপত্র পেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

শাফিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত দুই বছর থেকে বহু দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। শেষমেশ রোমানিয়ার একটি কোম্পানির কাজের অনুমতিপত্র পেয়েও ভারতের ভিসা না পাওয়ায় দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা করতে পারছি না। ১২ অক্টোবর রোমানিয়ার দূতাবাসে আমার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল। অথচ এখনো ভারতের ভিসা করাতে পারলাম না।’

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, জীবনের স্বপ্নটা এখানেই থেমে যাচ্ছে।’

শাফিনের মতো আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কাজের অনুমতিপত্র পাওয়ার পরও বিদেশযাত্রা নিশ্চিত না হওয়ায় নিয়োগকর্তার নির্ধারিত সময়সীমা, আর্থিক ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যানে পতনের পাশাপাশি ভিসা ও সাক্ষাৎকারসংক্রান্ত জটিলতা জনশক্তি রপ্তানির বাজারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নির্দিষ্ট দেশে ভিসার অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের দূতাবাসে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য প্রক্রিয়াটি কঠিন হয়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতিতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিদেশে চাকরি বা পড়াশোনার প্রক্রিয়ায় আটকে পড়া আবেদনকারীদের জন্য কার্যকর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে ভিসা বাতিলের অভিযোগ, ভারতে যেতে না পারার কারণে আবেদন আটকে থাকার পরিসর এবং এর ফলে কতজন কর্মী বা শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হবে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর