দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণ হতে হবে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল: ড. তিতুমীর

এলডিসি উত্তরণ হতে হবে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল: ড. তিতুমীর

চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা গ্রেপ্তার

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম, সংসদে যাচ্ছে বিল

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলাদা বৈঠকের তেমন সুযোগ হবে না: হুমায়ুন কবির

জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা

আইজিপিসহ পুলিশ পদক পাচ্ছেন ৯২ সদস্য, চার ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি

শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

রাজশাহী স্টেশনে শিক্ষার্থীকে মারধর: ঘটনায় আনসারের সম্পৃক্ততা নেই, বলছে বাহিনী

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম, সংসদে যাচ্ছে বিল

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম, সংসদে যাচ্ছে বিল
শরিয়াহভিত্তিক নতুন স্কিম যুক্ত করার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার আওতা ও সুবিধা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক একটি স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এই স্কিমের আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে স্কিমটি চালুর আগে বিনিয়োগনীতি, তহবিল ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় নির্ধারণে আরও বেশ কিছু কারিগরি কাজ শেষ করতে হবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, এ স্কিমের কাঠামো ও পরিচালনপদ্ধতি নির্ধারণে কাজ চলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এনপিএর নির্বাহী চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের জন্য প্রয়োজনীয় আইনের খসড়া তৈরি করে জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে স্কিমটির বিনিয়োগ কাঠামো, পরিচালনব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণ করা হচ্ছে।

নতুন স্কিমে পেনশন তহবিলের অর্থ শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগনীতির ভিত্তিতে পরিচালনার কাঠামো তৈরি করা হবে। কোথায় বিনিয়োগ করা হবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর ক্ষেত্রে শুধু আইন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে তহবিলের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ দায়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে নতুন স্কিমের আর্থিক স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কত মানুষ এতে যুক্ত হতে পারেন, কত অর্থ জমা হতে পারে এবং ভবিষ্যতে কত অর্থ পেনশন হিসেবে পরিশোধ করতে হতে পারে—এসব হিসাবের ভিত্তিতেই কাঠামো চূড়ান্ত করার কথা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিশ্লেষণের ফলের ওপর বিনিয়োগ কাঠামো, মুনাফা বণ্টন এবং পেনশন সুবিধার বিভিন্ন দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

শুধু নতুন শরিয়াহভিত্তিক স্কিম নয়, বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাতেও বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পেনশনার নিজে জীবিত থাকলে আজীবন পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হারও ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে সরকারি মালিকানাধীন এমন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাঁরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধা পান না।

কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় আসবে এবং কী প্রক্রিয়ায় কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে।

বিদেশগামী কর্মীদের জন্যও ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগেই কর্মীদের এই স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর। এই বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কারণ পেনশন পাওয়ার বয়স কমানো হলে তহবিল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে অংশগ্রহণকারীদের সুবিধার পাশাপাশি তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এটিও এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার ফলে ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই এখানে বড় বিবেচনা।

সর্বজনীন পেনশনের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন মডেলে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা যায় এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কতটা আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে নতুন গ্রাহক নিবন্ধনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হচ্ছে। আগে একজন নতুন গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট দেশে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’, ‘সমতা’ ও ‘প্রবাস’—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। তাঁদের জমা করা অর্থ প্রায় ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন এবং সেখানে জমা হয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ এবং আর্থিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত একটি নিরীক্ষা কাঠামো যুক্ত হবে।

  • শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও এটি এখনো চূড়ান্তভাবে চালু হয়নি।
  • নতুন স্কিম চালুর আগে আইনি কাঠামো, সংসদীয় প্রক্রিয়া, বিনিয়োগনীতি ও অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ শেষ করতে হবে।
  • বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে ৫৫ বছর করা, তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়গুলো এখনো আলোচনাধীন।
  • নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন প্রণোদনা ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনের নতুন শরিয়াহভিত্তিক স্কিম এমন একটি জনগোষ্ঠীকে কর্মসূচির আওতায় আনতে পারে, যারা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে আগ্রহী। তবে নতুন স্কিমের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে এর বিনিয়োগনীতি, মুনাফা বণ্টন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতার ওপর।

অন্যদিকে, সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু নতুন স্কিম চালু করাই যথেষ্ট নয়। গ্রাহকেরা তাঁদের জমা অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে মুনাফা নির্ধারিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কতটা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এসব তথ্য সহজ ভাষায় জানতে চাইবেন। তাই নতুন স্কিমের পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু স্কিমের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা। শরিয়াহভিত্তিক স্কিম সেই ব্যবস্থায় নতুন অংশগ্রহণকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আইনগত অনুমোদন, বিনিয়োগ কাঠামো ও আর্থিক স্থায়িত্বের হিসাব চূড়ান্ত হওয়ার পরই বোঝা যাবে নতুন স্কিমটি বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে।

একই সঙ্গে বিদ্যমান চার স্কিমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, তহবিলের বিনিয়োগ, মুনাফার হার এবং ভবিষ্যৎ পেনশন দায়—এসব তথ্য নিয়মিত ও সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা হলে কর্মসূচিটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সুতরাং শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিমের অনুমোদনকে আপাতত একটি প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখা যায়। আইন প্রণয়ন, সংসদীয় অনুমোদন, বিনিয়োগনীতি এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার পরই এর বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।

বিষয় : সর্বজনীন পেনশন শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম সর্বজনীন পেনশনে নতুন স্কিম শরিয়াহভিত্তিক পেনশন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম, সংসদে যাচ্ছে বিল

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক একটি স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এই স্কিমের আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে স্কিমটি চালুর আগে বিনিয়োগনীতি, তহবিল ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় নির্ধারণে আরও বেশ কিছু কারিগরি কাজ শেষ করতে হবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, এ স্কিমের কাঠামো ও পরিচালনপদ্ধতি নির্ধারণে কাজ চলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এনপিএর নির্বাহী চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের জন্য প্রয়োজনীয় আইনের খসড়া তৈরি করে জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে স্কিমটির বিনিয়োগ কাঠামো, পরিচালনব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণ করা হচ্ছে।

নতুন স্কিমে পেনশন তহবিলের অর্থ শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগনীতির ভিত্তিতে পরিচালনার কাঠামো তৈরি করা হবে। কোথায় বিনিয়োগ করা হবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর ক্ষেত্রে শুধু আইন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে তহবিলের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ দায়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে নতুন স্কিমের আর্থিক স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কত মানুষ এতে যুক্ত হতে পারেন, কত অর্থ জমা হতে পারে এবং ভবিষ্যতে কত অর্থ পেনশন হিসেবে পরিশোধ করতে হতে পারে—এসব হিসাবের ভিত্তিতেই কাঠামো চূড়ান্ত করার কথা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিশ্লেষণের ফলের ওপর বিনিয়োগ কাঠামো, মুনাফা বণ্টন এবং পেনশন সুবিধার বিভিন্ন দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

শুধু নতুন শরিয়াহভিত্তিক স্কিম নয়, বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাতেও বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পেনশনার নিজে জীবিত থাকলে আজীবন পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হারও ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে সরকারি মালিকানাধীন এমন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাঁরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধা পান না।

কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় আসবে এবং কী প্রক্রিয়ায় কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে।

বিদেশগামী কর্মীদের জন্যও ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগেই কর্মীদের এই স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর। এই বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কারণ পেনশন পাওয়ার বয়স কমানো হলে তহবিল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে অংশগ্রহণকারীদের সুবিধার পাশাপাশি তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এটিও এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার ফলে ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই এখানে বড় বিবেচনা।

সর্বজনীন পেনশনের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন মডেলে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা যায় এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কতটা আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে নতুন গ্রাহক নিবন্ধনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হচ্ছে। আগে একজন নতুন গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট দেশে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’, ‘সমতা’ ও ‘প্রবাস’—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। তাঁদের জমা করা অর্থ প্রায় ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন এবং সেখানে জমা হয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ এবং আর্থিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত একটি নিরীক্ষা কাঠামো যুক্ত হবে।

  • শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও এটি এখনো চূড়ান্তভাবে চালু হয়নি।
  • নতুন স্কিম চালুর আগে আইনি কাঠামো, সংসদীয় প্রক্রিয়া, বিনিয়োগনীতি ও অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ শেষ করতে হবে।
  • বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে ৫৫ বছর করা, তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়গুলো এখনো আলোচনাধীন।
  • নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন প্রণোদনা ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনের নতুন শরিয়াহভিত্তিক স্কিম এমন একটি জনগোষ্ঠীকে কর্মসূচির আওতায় আনতে পারে, যারা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে আগ্রহী। তবে নতুন স্কিমের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে এর বিনিয়োগনীতি, মুনাফা বণ্টন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতার ওপর।

অন্যদিকে, সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু নতুন স্কিম চালু করাই যথেষ্ট নয়। গ্রাহকেরা তাঁদের জমা অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে মুনাফা নির্ধারিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কতটা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এসব তথ্য সহজ ভাষায় জানতে চাইবেন। তাই নতুন স্কিমের পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু স্কিমের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা। শরিয়াহভিত্তিক স্কিম সেই ব্যবস্থায় নতুন অংশগ্রহণকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আইনগত অনুমোদন, বিনিয়োগ কাঠামো ও আর্থিক স্থায়িত্বের হিসাব চূড়ান্ত হওয়ার পরই বোঝা যাবে নতুন স্কিমটি বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে।

একই সঙ্গে বিদ্যমান চার স্কিমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, তহবিলের বিনিয়োগ, মুনাফার হার এবং ভবিষ্যৎ পেনশন দায়—এসব তথ্য নিয়মিত ও সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা হলে কর্মসূচিটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সুতরাং শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিমের অনুমোদনকে আপাতত একটি প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখা যায়। আইন প্রণয়ন, সংসদীয় অনুমোদন, বিনিয়োগনীতি এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার পরই এর বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর