একসময় যে জমিতে ফসল ফলাতে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতেন কৃষকেরা, সেই জমিতেই এখন বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন গ্রামের নারীরা। শুধু নিজেরা চাষ করেই থেমে নেই, অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ করছেন এবং গড়ে তুলছেন কৃষাণি সংগঠন।
নেত্রকোনার পাঁচটি উপজেলায় নারীদের এমন উদ্যোগে ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা। ইতোমধ্যে কৃষক, কৃষাণি, যুব ও কিশোরীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন। এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কয়েক হাজার নারী ও তরুণ।
জেলার সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা কৃষি শিখন কেন্দ্রগুলো এখন কৃষি পরামর্শ, বীজ সংরক্ষণ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের পরিচিত জায়গা হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বিশনাথপুর গ্রামের মর্জিনা বেগম এবং আটপাড়া উপজেলার মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশনাথপুর গ্রামের কৃষি শিখন কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন কৃষাণি মর্জিনা বেগম। তাঁর উদ্যোগে গ্রামের নারীরা নিজেরাই জৈব বালাইনাশক তৈরি করছেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের কাজেও যুক্ত হয়েছেন তাঁরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিকের মাধ্যমে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন নারী প্রথমে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁদের কাজ দেখে ধীরে ধীরে অন্য নারীরাও এগিয়ে আসেন। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগটি রূপ নেয় সম্মিলিত কৃষি আন্দোলনে।
এখন গ্রামের নারীরা শুধু সবজি উৎপাদন করছেন না, কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হবে, কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কীভাবে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করতে হয়, সেসব বিষয়েও অন্যদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এসব এলাকার জমিতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কীটনাশকের ব্যবহার পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
তবে এসব রোগের সঙ্গে কীটনাশকের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিতে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় নারীরা আরও জানান, জমির পাশে পোকামাকড় দমনে বিষ প্রয়োগের কারণে সড়কের পাশের কিছু গাছ ধূসর হয়ে মারা যাচ্ছে। একসময় গবাদিপশুর খাবার হিসেবে পরিচিত দুর্বাঘাসও অনেক জায়গায় কমে গেছে বলে তাঁদের দাবি।
এমন পরিস্থিতিতে বিষমুক্ত কৃষি শুধু নিরাপদ খাবার উৎপাদনের বিষয় নয়, মাটি, পানি, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গেও জড়িত। কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক পদ্ধতি বাড়ানো গেলে কৃষক ও পরিবেশ—দুই পক্ষই উপকৃত হতে পারে।
আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের বাড়ি এখন আশপাশের মানুষের কাছে কৃষি শেখার জায়গা হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয় জাতের বিলুপ্তপ্রায় বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে কাজ করছেন তিনি। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ তাঁর কাছ থেকে কৃষি পরামর্শ নিতে আসেন। কোন বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, কোন ফসল কোন মৌসুমে ভালো হয়—এসব বিষয়েও তিনি নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় বীজের বৈচিত্র্য ধরে রাখা। বাজারের বীজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে কৃষকেরা নিজেদের এলাকার উপযোগী বীজ সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যতে চাষাবাদের বিকল্প সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদের বায়োগ্যাস ব্যবহারে গ্রামের নারী ও অন্য বাসিন্দাদের উৎসাহিত করছেন। এতে কৃষি ও পারিবারিক জীবনে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলায় কৃষক, কৃষাণি, যুব ও কিশোরীদের নিয়ে মোট ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন গড়ে উঠেছে।
এর মধ্যে ৫৭টি নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১ হাজার ১৪০ জন নারী। এ ছাড়া ২৩টি কিশোরী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে কাজ করছেন ৪৬০ জন কিশোরী।
ডোনাপাড়া ও গাছগরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষাণি ও যুব সংগঠনগুলো বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের আওতায় কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নিরাপদ খাদ্য: রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের চেষ্টা।
নারীর কর্মসংস্থান: কৃষি প্রশিক্ষণ, সংগঠন পরিচালনা ও উৎপাদনের মাধ্যমে নারীদের আয় ও কাজের সুযোগ তৈরি।
বীজ সংরক্ষণ: স্থানীয় ও বিলুপ্তপ্রায় জাতের বীজ সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ চাষাবাদের জন্য সংরক্ষণ।
পরিবেশ রক্ষা: জৈব বালাইনাশক, বায়োগ্যাস ও প্রাকৃতিক কৃষিপদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো।
নেত্রকোনার গ্রামগুলোতে নারীদের এই উদ্যোগের একটি বিশেষ দিক হলো, তাঁরা কৃষিকে শুধু ফসল উৎপাদনের কাজ হিসেবে দেখছেন না। বরং বীজ সংরক্ষণ, মাটির যত্ন, পরিবেশ রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—একজন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের জমিতে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন, এরপর অন্য নারীদের শেখাচ্ছেন। এভাবে একজনের অভিজ্ঞতা পুরো গ্রামের কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করছে। অর্থাৎ কৃষি শিখন কেন্দ্রগুলো শুধু প্রশিক্ষণের জায়গা নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
তবে এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে রাখতে হলে কৃষাণিদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা, নিয়মিত কৃষি পরামর্শ দেওয়া এবং জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের খরচ ও ফলন নিয়ে বাস্তব তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, রোগবালাই শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
নিরাপদ খাবার প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন। বাজারে সবজি কেনার সময় শুধু রং, আকার কিংবা দাম দেখলেই হবে না; কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃষকদেরও মনে রাখতে হবে, কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং নির্ধারিত সময় মেনে চলা জরুরি। শুধু বিষমুক্ত কৃষির প্রচার নয়, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
নেত্রকোনার মর্জিনা বেগম, কবিতা খাতুনসহ গ্রামের নারীদের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও কৃষিতে বড় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা কৃষাণি সংগঠনগুলো এখন নিরাপদ খাদ্য, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
একসময় যে জমিতে ফসল ফলাতে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতেন কৃষকেরা, সেই জমিতেই এখন বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন গ্রামের নারীরা। শুধু নিজেরা চাষ করেই থেমে নেই, অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ করছেন এবং গড়ে তুলছেন কৃষাণি সংগঠন।
নেত্রকোনার পাঁচটি উপজেলায় নারীদের এমন উদ্যোগে ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা। ইতোমধ্যে কৃষক, কৃষাণি, যুব ও কিশোরীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন। এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কয়েক হাজার নারী ও তরুণ।
জেলার সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা কৃষি শিখন কেন্দ্রগুলো এখন কৃষি পরামর্শ, বীজ সংরক্ষণ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের পরিচিত জায়গা হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বিশনাথপুর গ্রামের মর্জিনা বেগম এবং আটপাড়া উপজেলার মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশনাথপুর গ্রামের কৃষি শিখন কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন কৃষাণি মর্জিনা বেগম। তাঁর উদ্যোগে গ্রামের নারীরা নিজেরাই জৈব বালাইনাশক তৈরি করছেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের কাজেও যুক্ত হয়েছেন তাঁরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিকের মাধ্যমে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন নারী প্রথমে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁদের কাজ দেখে ধীরে ধীরে অন্য নারীরাও এগিয়ে আসেন। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগটি রূপ নেয় সম্মিলিত কৃষি আন্দোলনে।
এখন গ্রামের নারীরা শুধু সবজি উৎপাদন করছেন না, কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হবে, কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কীভাবে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করতে হয়, সেসব বিষয়েও অন্যদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এসব এলাকার জমিতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কীটনাশকের ব্যবহার পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
তবে এসব রোগের সঙ্গে কীটনাশকের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিতে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় নারীরা আরও জানান, জমির পাশে পোকামাকড় দমনে বিষ প্রয়োগের কারণে সড়কের পাশের কিছু গাছ ধূসর হয়ে মারা যাচ্ছে। একসময় গবাদিপশুর খাবার হিসেবে পরিচিত দুর্বাঘাসও অনেক জায়গায় কমে গেছে বলে তাঁদের দাবি।
এমন পরিস্থিতিতে বিষমুক্ত কৃষি শুধু নিরাপদ খাবার উৎপাদনের বিষয় নয়, মাটি, পানি, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গেও জড়িত। কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক পদ্ধতি বাড়ানো গেলে কৃষক ও পরিবেশ—দুই পক্ষই উপকৃত হতে পারে।
আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের বাড়ি এখন আশপাশের মানুষের কাছে কৃষি শেখার জায়গা হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয় জাতের বিলুপ্তপ্রায় বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে কাজ করছেন তিনি। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ তাঁর কাছ থেকে কৃষি পরামর্শ নিতে আসেন। কোন বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, কোন ফসল কোন মৌসুমে ভালো হয়—এসব বিষয়েও তিনি নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় বীজের বৈচিত্র্য ধরে রাখা। বাজারের বীজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে কৃষকেরা নিজেদের এলাকার উপযোগী বীজ সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যতে চাষাবাদের বিকল্প সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদের বায়োগ্যাস ব্যবহারে গ্রামের নারী ও অন্য বাসিন্দাদের উৎসাহিত করছেন। এতে কৃষি ও পারিবারিক জীবনে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলায় কৃষক, কৃষাণি, যুব ও কিশোরীদের নিয়ে মোট ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন গড়ে উঠেছে।
এর মধ্যে ৫৭টি নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১ হাজার ১৪০ জন নারী। এ ছাড়া ২৩টি কিশোরী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে কাজ করছেন ৪৬০ জন কিশোরী।
ডোনাপাড়া ও গাছগরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষাণি ও যুব সংগঠনগুলো বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের আওতায় কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নিরাপদ খাদ্য: রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের চেষ্টা।
নারীর কর্মসংস্থান: কৃষি প্রশিক্ষণ, সংগঠন পরিচালনা ও উৎপাদনের মাধ্যমে নারীদের আয় ও কাজের সুযোগ তৈরি।
বীজ সংরক্ষণ: স্থানীয় ও বিলুপ্তপ্রায় জাতের বীজ সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ চাষাবাদের জন্য সংরক্ষণ।
পরিবেশ রক্ষা: জৈব বালাইনাশক, বায়োগ্যাস ও প্রাকৃতিক কৃষিপদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো।
নেত্রকোনার গ্রামগুলোতে নারীদের এই উদ্যোগের একটি বিশেষ দিক হলো, তাঁরা কৃষিকে শুধু ফসল উৎপাদনের কাজ হিসেবে দেখছেন না। বরং বীজ সংরক্ষণ, মাটির যত্ন, পরিবেশ রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—একজন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের জমিতে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন, এরপর অন্য নারীদের শেখাচ্ছেন। এভাবে একজনের অভিজ্ঞতা পুরো গ্রামের কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করছে। অর্থাৎ কৃষি শিখন কেন্দ্রগুলো শুধু প্রশিক্ষণের জায়গা নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
তবে এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে রাখতে হলে কৃষাণিদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা, নিয়মিত কৃষি পরামর্শ দেওয়া এবং জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের খরচ ও ফলন নিয়ে বাস্তব তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, রোগবালাই শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
নিরাপদ খাবার প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন। বাজারে সবজি কেনার সময় শুধু রং, আকার কিংবা দাম দেখলেই হবে না; কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃষকদেরও মনে রাখতে হবে, কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং নির্ধারিত সময় মেনে চলা জরুরি। শুধু বিষমুক্ত কৃষির প্রচার নয়, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
নেত্রকোনার মর্জিনা বেগম, কবিতা খাতুনসহ গ্রামের নারীদের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও কৃষিতে বড় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা কৃষাণি সংগঠনগুলো এখন নিরাপদ খাদ্য, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

আপনার মতামত লিখুন