প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নবজাতক ওয়ার্ডের সামনে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে রাত গভীর হলে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয় এবং আটক থাকা দুই যুবককে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল দের সাত দিনের কন্যাশিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৫ মে তাকে শেবাচিম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর শিশুটির মৃত্যু হয়।
এরপরই শুরু হয় মূল উত্তেজনা। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে পরিবেশ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পর তারা আবেগাপ্লুত হয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এই সময় একদল ইন্টার্ন শিক্ষার্থী দুই যুবকের ওপর চড়াও হন। অভিযোগ রয়েছে, একজনকে মারধর করা হয় এবং আরেকজন ভিডিও ধারণ করতে গেলে তিনিও হামলার শিকার হন। পরে তাদের হাসপাতালের নিচতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এই আটকে রাখার সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। কেউ বলছেন কয়েক ঘণ্টা, আবার কেউ বলছেন প্রায় সাত ঘণ্টা পর্যন্ত পরিস্থিতি চলেছে।
নবজাতকের বাবা উজ্জ্বল দে বলেন, সন্ধ্যার পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তারা চিকিৎসকদের সহায়তা চান। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তার ভাষায়, “আমার এক আত্মীয় আবেগের মধ্যে কিছু কথা বলেছে, কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে ও আরেকজনকে মারধর করে আটকে রাখা হয়।”
শিশুটির মা পূজা রানী দাস বলেন, মৃত্যুর শোকের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তার দাবি, তার আত্মীয়কে বিনা উসকানিতে মারধর করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি উল্টো দিক থেকে শুরু হয়।
ইন্টার্ন শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে থাকা ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার সময় কিছু ব্যক্তি তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং টানাহেঁচড়া করেন। এরপর তারা নিরাপত্তার জন্য একটি কক্ষে আশ্রয় নেন।
আরেক ইন্টার্ন শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার জানান, রোগীর স্বজনরা নারী শিক্ষার্থীদের অ্যাপ্রোন ও ব্যাগ টানাটানি করেন এবং নার্সদের সঙ্গেও অসদাচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং রোগীদের সেবা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা জানান, ঘটনাটি মূলত কথা-কাটাকাটির জেরে তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রোগীর স্বজনদের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। একদিকে থাকে চিকিৎসা বিলম্ব, জনবল সংকট ও চাপ, অন্যদিকে থাকে রোগীর পরিবারের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি মুহূর্তে যোগাযোগের ঘাটতি সবচেয়ে বড় সমস্যা। রোগীর অবস্থা বুঝিয়ে বলা না গেলে স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়, যা অনেক সময় উত্তেজনায় রূপ নেয়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো—হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের ঘাটতি। এই দুইয়ের মিশ্রণে ছোট ঘটনা অনেক সময় বড় সংঘাতে রূপ নেয়।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, মৃত্যু বা সংকটময় পরিস্থিতিতে মানুষ স্বাভাবিক যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে। শোক, রাগ ও ভয়ের সংমিশ্রণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা সংঘর্ষকে আরও উসকে দেয়।
শেবাচিম হাসপাতালের এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ নয়, বরং হাসপাতাল ব্যবস্থার ভেতরের চাপ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নবজাতক ওয়ার্ডের সামনে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে রাত গভীর হলে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয় এবং আটক থাকা দুই যুবককে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল দের সাত দিনের কন্যাশিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৫ মে তাকে শেবাচিম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর শিশুটির মৃত্যু হয়।
এরপরই শুরু হয় মূল উত্তেজনা। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে পরিবেশ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পর তারা আবেগাপ্লুত হয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এই সময় একদল ইন্টার্ন শিক্ষার্থী দুই যুবকের ওপর চড়াও হন। অভিযোগ রয়েছে, একজনকে মারধর করা হয় এবং আরেকজন ভিডিও ধারণ করতে গেলে তিনিও হামলার শিকার হন। পরে তাদের হাসপাতালের নিচতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এই আটকে রাখার সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। কেউ বলছেন কয়েক ঘণ্টা, আবার কেউ বলছেন প্রায় সাত ঘণ্টা পর্যন্ত পরিস্থিতি চলেছে।
নবজাতকের বাবা উজ্জ্বল দে বলেন, সন্ধ্যার পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তারা চিকিৎসকদের সহায়তা চান। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তার ভাষায়, “আমার এক আত্মীয় আবেগের মধ্যে কিছু কথা বলেছে, কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে ও আরেকজনকে মারধর করে আটকে রাখা হয়।”
শিশুটির মা পূজা রানী দাস বলেন, মৃত্যুর শোকের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তার দাবি, তার আত্মীয়কে বিনা উসকানিতে মারধর করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি উল্টো দিক থেকে শুরু হয়।
ইন্টার্ন শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে থাকা ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার সময় কিছু ব্যক্তি তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং টানাহেঁচড়া করেন। এরপর তারা নিরাপত্তার জন্য একটি কক্ষে আশ্রয় নেন।
আরেক ইন্টার্ন শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার জানান, রোগীর স্বজনরা নারী শিক্ষার্থীদের অ্যাপ্রোন ও ব্যাগ টানাটানি করেন এবং নার্সদের সঙ্গেও অসদাচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং রোগীদের সেবা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা জানান, ঘটনাটি মূলত কথা-কাটাকাটির জেরে তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রোগীর স্বজনদের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। একদিকে থাকে চিকিৎসা বিলম্ব, জনবল সংকট ও চাপ, অন্যদিকে থাকে রোগীর পরিবারের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি মুহূর্তে যোগাযোগের ঘাটতি সবচেয়ে বড় সমস্যা। রোগীর অবস্থা বুঝিয়ে বলা না গেলে স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়, যা অনেক সময় উত্তেজনায় রূপ নেয়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো—হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের ঘাটতি। এই দুইয়ের মিশ্রণে ছোট ঘটনা অনেক সময় বড় সংঘাতে রূপ নেয়।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, মৃত্যু বা সংকটময় পরিস্থিতিতে মানুষ স্বাভাবিক যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে। শোক, রাগ ও ভয়ের সংমিশ্রণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা সংঘর্ষকে আরও উসকে দেয়।
শেবাচিম হাসপাতালের এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ নয়, বরং হাসপাতাল ব্যবস্থার ভেতরের চাপ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।

আপনার মতামত লিখুন