রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান, ছড়াচ্ছে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি
মহাকাশে এমন এক ধরনের রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যেগুলো থেকে অস্বাভাবিক মাত্রায় কম শক্তির এক্স-রে ও তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত হচ্ছে। এসব বস্তুর আচরণ এখন পর্যন্ত পরিচিত অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর তুলনায় অনেকটাই আলাদা বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি ব্যবহার করে পুরোনো মহাকাশ-তথ্য বিশ্লেষণের সময় এই নতুন শ্রেণির বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষকদের এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের কিছু পুরোনো রহস্য বুঝতে নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।বুধবার Nature Astronomy জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই আবিষ্কারের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় ৬টি ভিন্ন ছায়াপথে মোট ৮৪টি এমন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পাওয়া গেছে।এসব বস্তুকে আপাতত ‘হাইপারসফট এক্স-রে সোর্স’ বলা হচ্ছে। তালিকায় থাকা ছায়াপথগুলোর মধ্যে রয়েছে—অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথপিনহুইল ছায়াপথআরও চারটি উপবৃত্তাকার ছায়াপথগবেষকদের নজরে পড়েছে, এসব বস্তু শুধু নতুন তারা তৈরির অঞ্চলে নয়, বরং পুরোনো তারায় ভরা এলাকাতেও অবস্থান করছে। এর ফলে বস্তুগুলোর উৎপত্তি ও গঠন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোর সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—উচ্চ শক্তির এক্স-রে পর্যবেক্ষণে এগুলো প্রায় অদৃশ্য থাকে। কিন্তু কম শক্তির এক্স-রে ইমেজে বস্তুগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি নির্গমনের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, এসব বস্তু এমন এক ধরনের বিকিরণ তৈরি করছে, যা সাধারণ মহাজাগতিক উৎসগুলোর তুলনায় আলাদা আচরণ দেখায়।জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের দুটি দীর্ঘদিনের রহস্য নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে মহাজাগতিক বাইনারি সিস্টেম, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং উচ্চ শক্তির বিকিরণ কীভাবে তৈরি হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।নতুন শনাক্ত হওয়া বস্তুগুলোর প্রকৃত পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি গবেষকরা। তাদের ধারণা, এগুলো সম্ভবত কোনো বাইনারি সিস্টেমের অংশ।বাইনারি সিস্টেম হলো এমন একটি মহাজাগতিক ব্যবস্থা, যেখানে দুটি নক্ষত্র বা ঘন মহাজাগতিক বস্তু পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এই ব্যবস্থায় একটি বস্তু তার সঙ্গী নক্ষত্র থেকে পদার্থ টেনে নিতে পারে।সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিজ্ঞানীরা কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করছেন—ব্ল্যাকহোল ও নক্ষত্রের সমন্বয়ে তৈরি ব্যবস্থানিউট্রন স্টার ও সঙ্গী নক্ষত্রের বাইনারি সিস্টেমশ্বেত বামন বা হোয়াইট ডোয়ার্ফকে ঘিরে তৈরি ব্যবস্থাঅন্য কোনো অজানা ঘন মহাজাগতিক বস্তুর সমন্বিত কাঠামোসঙ্গী নক্ষত্র থেকে পদার্থ টেনে নেওয়ার সময় এসব বস্তু প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। সেই উত্তাপ থেকেই এক্স-রে ও অতিবেগুনি রশ্মি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মহাবিশ্বে এমন আরও অনেক বাইনারি সিস্টেম থাকতে পারে, যেগুলো এখনো মানুষের পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়েছে।এতদিন মহাকাশ পর্যবেক্ষণে অনেক গবেষণা উচ্চ শক্তির এক্স-রে কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু নতুন গবেষণাটি দেখাচ্ছে, কম শক্তির এক্স-রে ও অতিবেগুনি রশ্মির তথ্যও মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত দূরবীক্ষণযন্ত্র ও বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা গেলে এসব বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।গুরুত্বপূর্ণ দিক৬টি ছায়াপথে মোট ৮৪টি রহস্যময় বস্তু শনাক্ত হয়েছে।বস্তুগুলো কম শক্তির এক্স-রে ও তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি ছড়ায়।উচ্চ শক্তির এক্স-রেতে এগুলো তুলনামূলকভাবে অদৃশ্য থাকে।এগুলো ব্ল্যাকহোল, নিউট্রন স্টার বা শ্বেত বামনভিত্তিক বাইনারি সিস্টেম হতে পারে।গবেষকরা এখনো বস্তুগুলোর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।মহাকাশ নিয়ে নতুন কোনো আবিষ্কারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও, গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিজ্ঞানীরা এখনো এসব বস্তুর প্রকৃতি নিয়ে কাজ করছেন। তাই এগুলো নিশ্চিতভাবে ব্ল্যাকহোল বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বস্তু—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।এই গবেষণা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যত বাড়ছে, অজানা প্রশ্নও তত সামনে আসছে। যে বস্তুগুলো এতদিন মহাকাশের অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল, নতুন প্রযুক্তি ও পুরোনো তথ্যের পুনর্বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেগুলোও ধীরে ধীরে মানুষের নজরে আসছে।নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির তথ্য বিশ্লেষণে পাওয়া এই ৮৪টি মহাজাগতিক বস্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি, কম শক্তির এক্স-রে এবং অস্বাভাবিক আচরণের কারণে এগুলো বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।তবে এসব বস্তুর প্রকৃত গঠন ও উৎস জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। মহাকাশের এই রহস্য ভবিষ্যতে ব্ল্যাকহোল, নিউট্রন স্টার এবং বাইনারি সিস্টেম সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।