দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

নীলফামারীতে পেট্রল ঢেলে আগুন: ৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানলেন গৃহবধূ বিথী

নীলফামারীতে স্বামীর বিরুদ্ধে পেট্রল ঢেলে আগুনে ঝলসে দেওয়ার অভিযোগের সাত দিন পর মারা গেছেন গৃহবধূ বিথী আক্তার (২৫)। শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।নিহত বিথী আক্তার সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের নিজামের চৌপথী এলাকার বড়বাড়ি গ্রামের বাবুল হোসেনের মেয়ে। পাঁচ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় একই উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের সোনাখুলী জামবাড়ি গ্রামের সাজু খানের সঙ্গে। তাদের সংসারে তিন বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।পারিবারিক কলহের জেরে আগুন দেওয়ার অভিযোগস্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিথীকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নির্যাতন করা হতো। সর্বশেষ গত ৯ মে রাত ৮টার দিকে পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে স্বামী সাজু খান তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর ঘরের গেটে তালা লাগিয়ে ছোট শিশুসন্তানকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যান তিনি।[TECHTARANGA-POST:1275]স্থানীয়রা জানান, আগুনে পুড়তে থাকা অবস্থায় বিথীর চিৎকার শুনে পাশের বাড়ির বাসিন্দা নাজমিন বেগম এগিয়ে আসেন। পরে তাঁর ডাক শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় বিথীকে উদ্ধার করেন।প্রথমে তাঁকে নীলফামারী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে পরদিন ১০ মে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শুক্রবার তিনি মারা যান।“মেয়েকে বাঁচাতে যা পেরেছি করেছি”বিথীর মা মাসুদা আক্তার দাবি করেন, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তাঁর মেয়েকে চাপ দেওয়া হতো। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।তিনি বলেন, “মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে আমরা অনেক কিছু করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। এখন আমরা এর বিচার চাই।”স্বজনদের ভাষ্য, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সাজু খান আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে যাওয়ার আগে তিনি গোপনে এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে শিশুসন্তানকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন।মামলার পর অভিযুক্ত পলাতকঘটনার পর নিহতের চাচা লোকমান হোসেন বাদী হয়ে নীলফামারী সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তকে ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান বলেন, “গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত স্বামী ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।”তবে এখন পর্যন্ত অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।[TECHTARANGA-POST:1232]প্রতিবেশীদের ভাষ্য: প্রায়ই ঝগড়া হতোস্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, দাম্পত্য কলহ নিয়ে ওই পরিবারে প্রায়ই ঝামেলা হতো। তবে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে উঠবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।এক প্রতিবেশী বলেন, “ওদের সংসারে অশান্তি ছিল। কিন্তু একজন মানুষ নিজের স্ত্রীর গায়ে আগুন দিতে পারে, এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।”আরেকজনের ভাষ্য, ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।নারী নির্যাতন নিয়ে নতুন করে প্রশ্নএই ঘটনার পর আবারও পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সমাজকর্মীরা বলছেন, অনেক নারী বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক চাপ, সন্তানের ভবিষ্যৎ বা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে মুখ খুলতে পারেন না।বিশ্লেষকদের মতে, যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতার মতো বিষয়গুলো এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে। আইনি ব্যবস্থা থাকলেও সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় অনেক ঘটনায় নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।তারা বলছেন, শুধু ঘটনার পর মামলা করলেই হবে না, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।শনিবার দাফননিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, শনিবার (১৬ মে) বাবার বাড়িতে বিথীর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। [TECHTARANGA-POST:1263] এদিকে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, একটি তিন বছরের শিশুকে মায়ের মৃত্যু ও এমন ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি নিয়েই বড় হতে হবে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে পারিবারিক সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা।

নীলফামারীতে পেট্রল ঢেলে আগুন: ৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানলেন গৃহবধূ বিথী