নিয়ামতপুরে চার খুনের ঘটনায় আদালতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি, পরিকল্পনার বর্ণনা দিলেন ভাগনে
নওগাঁর নিয়ামতপুরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ভাগনে সবুজ রানা (২৫)। এই ঘটনায় এলাকায় আরও শোক ও আতঙ্কের ছায়া ঘনীভূত হয়েছে।ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার গভীর রাতে, উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায়।আদালতে হত্যার পরিকল্পনা স্বীকারবুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে নওগাঁর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সবুজ রানা। সেখানে তিনি মামা হাবিবুর রহমান ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বর্ণনা দেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।একই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া শহিদুল মণ্ডল (৫০) ও তার ছেলে শাহিন মণ্ডলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে, যার শুনানি নির্ধারিত রয়েছে বৃহস্পতিবার।জমি বিরোধ থেকেই নৃশংসতার সূত্রপাতমামলার তদন্ত কর্মকর্তা চাঁদ আলী জানান, নিহত হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তার ভাগনে সবুজ রানার পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। জমির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ক্ষোভ থেকেই এই ঘটনা ঘটে বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সবুজ রানা আদালতে বলেছেন, তিনি মামাকে “নির্বংশ করার” হুমকি দিয়েছিলেন, যা পরে বাস্তব রূপ নেয়।ঘটনার রাতে কী ঘটেছিলজবানবন্দির বরাতে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুরে সবুজ রানা তার মামা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে ছাতড়া হাটে গরু কিনতে যান। তবে গরু না কিনেই সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফেরেন।রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি, শহিদুল মণ্ডল ও শাহিন মণ্ডল মিলে হত্যার প্রস্তুতি নেন।সবুজ রানা জানান, তিনি প্রথমে মামার বাড়িতে খাওয়ার পর চলে যাওয়ার ভান করেন। এ সময় শাহিন বাড়ির একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মূল দরজা খুলে দেন শাহিন।এরপর ধাপে ধাপে তারা বাড়িতে প্রবেশ করেন।একে একে চারজনকে হত্যাজবানবন্দি অনুযায়ী, প্রথমে নিহত হাবিবুর রহমানের বাবার ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে তিনি বের হতে না পারেন।পরে হাবিবুর রহমানের ঘরে ঢুকে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তার স্ত্রী পপি সুলতানা ও দুই শিশু—পারভেজ রহমান (৯) এবং সাদিয়া আক্তার (৩)—কেও হত্যা করা হয়।এই নির্মম ঘটনার পর পুরো এলাকা আতঙ্ক ও শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তারঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন শহিদুল মণ্ডল, শাহিন মণ্ডল এবং সবুজ রানা।প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্পত্তি বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।এলাকাজুড়ে শোক ও আতঙ্কস্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে—তা কেউ কল্পনাও করেননি।একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “একটি পরিবারকে এভাবে শেষ করে দেওয়া সত্যিই ভয়াবহ ঘটনা। পুরো গ্রাম এখন আতঙ্কে আছে।”গ্রামীণ বিরোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নস্থানীয়রা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকলে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ নেয়। বাহাদুরপুরের এই ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি নির্মম উদাহরণ।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বলছে, পারিবারিক বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে তা বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপপুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে নতুন করে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে।তদন্ত শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।শেষ কথা
একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ কীভাবে পুরো একটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দিতে পারে—নিয়ামতপুরের এই ঘটনা তারই ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে থাকল। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন নৃশংস ঘটনা আর না ঘটে।