পুলিশের ‘বিশৃঙ্খলা’ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, দাবি আইজিপির
খিলক্ষেতে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধনে জনবান্ধব বাহিনী গড়ার আশ্বাসদেশের পুলিশ বাহিনীর ভেতরে গত কয়েক বছরে যে অস্থিরতা ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে, তা এখন অনেকটাই সামাল দেওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।শুক্রবার (৮ মে) দুপুরে রাজধানীর খিলক্ষেতে নতুন একটি পুলিশ ফাঁড়ি ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।দীর্ঘ বিরতির পর নতুনভাবে ‘পুলিশ সপ্তাহ’ আয়োজনের পরিকল্পনাবক্তব্যে আইজিপি জানান, কয়েক বছর ধরে নানা কারণে পুলিশ সপ্তাহ আগের মতো আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, করোনা মহামারি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে পুলিশ সপ্তাহের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুনভাবে এই আয়োজন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সপ্তাহ শুধু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে পেশাগত শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং জনসেবার মান বাড়ানোর একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আরও জোরদার হবে।[TECHTARANGA-POST:1132]আইজিপি বলেন, “বাহিনীর মধ্যে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন আমাদের লক্ষ্য—জনগণের আস্থা আরও বাড়ানো।”পোশাক পরিবর্তন ও কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিতপুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা প্রসঙ্গেও কথা বলেন আলী হোসেন ফকির। তিনি জানান, বর্তমান ইউনিফর্মে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়াতে আরও কিছু সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।যদিও কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তবে পুলিশের একাধিক সদস্যের দাবি, মাঠপর্যায়ে কাজের সুবিধা, আবহাওয়া এবং নিরাপত্তার বিষয় মাথায় রেখে পোশাকের কিছু অংশে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখা এখন সরকারের অগ্রাধিকার। সেই কারণে পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগত। কিন্তু বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় দ্রুত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।আবাসন সংকটে ভুগছে বড় অংশের পুলিশ সদস্যঅনুষ্ঠানে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংকটের বিষয়ও সামনে আনেন মহাপরিদর্শক। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার সদস্য কর্মরত থাকলেও আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার সদস্যের জন্য।অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সদস্য এখনো পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছেন। এই ঘাটতি পূরণে আগামী অর্থবছরে নতুন প্রকল্প নেওয়া হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।পুলিশের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরেই আবাসন সমস্যা, কর্মঘণ্টা এবং মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাহিনীর সদস্যরা যদি মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ের কাজেও পড়তে পারে।[TECHTARANGA-POST:1119]যদিও পুলিশ সদরদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সদস্যদের কল্যাণমূলক উদ্যোগ বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।খিলক্ষেতে নতুন ফাঁড়ি, বাড়বে টহল ও দ্রুত সেবাখিলক্ষেত এলাকায় নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইজিপি বলেন, রাজধানীর এই অংশে জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগ থাকায় এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল।তার মতে, নতুন ফাঁড়ি চালু হওয়ায় খিলক্ষেত ও আশপাশের এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করা সহজ হবে। এতে অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং জরুরি ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও মনে করছেন, এলাকায় পুলিশি তৎপরতা বাড়লে ছিনতাই, মাদক ও চুরি-সংক্রান্ত অভিযোগ কমতে পারে। তবে কেউ কেউ বলছেন, শুধু নতুন ভবন করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে সেবার মান বাড়ানোও জরুরি।জনবান্ধব পুলিশ গঠনের চ্যালেঞ্জ কতটা?বাংলাদেশে পুলিশ নিয়ে জনমনে একদিকে যেমন নিরাপত্তার প্রত্যাশা রয়েছে, অন্যদিকে নানা অভিযোগ ও বিতর্কও প্রায়ই সামনে আসে। মানবাধিকার, হয়রানি, তদন্তের মান কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব—এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।এমন বাস্তবতায় আইজিপির বক্তব্যকে অনেকেই বাহিনীকে নতুনভাবে পুনর্গঠনের বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে “জনবান্ধব পুলিশ” গঠনের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেই দিকেই নজর থাকবে।[TECHTARANGA-POST:1105]নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন—এই চারটি জায়গায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারলে পুলিশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হতে পারে।সামনে কী?পুলিশ সপ্তাহ আয়োজন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং সদস্যদের কল্যাণ—এসব পরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আবাসন সংকট, জনবল চাপ এবং জনআস্থার প্রশ্নে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খিলক্ষেতের নতুন পুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনী নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে—এমনটাই মনে করছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা দেখতে পান।