দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

সাড়ে ৬ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গত ছয় বছর নয় মাসে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু, যা মোট শিশুমৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে মারা গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশু।সড়ক ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা এবং শিশুবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার অভাবকে এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।বুধবার (২১ অক্টোবর) সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী। এ বয়সসীমার ৩ হাজার ৫৪৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।বয়সভিত্তিক মৃত্যুর চিত্র হলো—১৩–১৭ বছর: ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু৬–১২ বছর: ২ হাজার ৮৮৪ শিশু০–৫ বছর: ১ হাজার ৫৩২ শিশুপরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহত শিশুদের বড় অংশই কিশোর বয়সী। এ বয়সে অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। কেউ কেউ মোটরসাইকেল চালানো বা এতে আরোহী হওয়ার সঙ্গেও যুক্ত থাকে। তবে বয়সভিত্তিক তথ্য একা দিয়ে দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না।সড়কের ধরন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু।প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মৃত্যুর সংখ্যা অনুযায়ী সড়কভিত্তিক চিত্র হলো—গ্রামীণ সড়ক: ২ হাজার ৭১৩ শিশুআঞ্চলিক সড়ক: ২ হাজার ৮২ শিশুমহাসড়ক: ১ হাজার ৯৭৪ শিশুশহরের সড়ক: ১ হাজার ১৯৪ শিশুরোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বসতবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সড়কে যান চলাচলের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং নজরদারির অভাব শিশুদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।গ্রামীণ এলাকায় সড়ক ও বসতবাড়ির মধ্যে দূরত্ব কম হওয়ায় শিশুদের চলাচল, খেলাধুলা ও দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে যানবাহনের চলাচল প্রায়ই একই জায়গায় মিশে যায়। এমন পরিস্থিতিতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং চালকদের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিবেদনের অন্যতম উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। মোট শিশুমৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ এ শ্রেণিতে পড়েছে।অন্যদিকে, পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৭১ জন থ্রি-হুইলারের ধাক্কা বা চাপায় মারা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এ তথ্য শিশুদের নিরাপত্তায় একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। মোটরসাইকেলে শিশুদের নিরাপদে বহন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যান চালানো প্রতিরোধ এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা—সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।সময়ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বিকেলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৫১৩ শিশু।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় শিশুদের সড়ক পারাপার, যানবাহনে ওঠানামা এবং ব্যস্ত সড়কের পাশে চলাচল বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে বিকেল বা স্কুলে যাওয়া-আসার সময় দুর্ঘটনার পেছনে ঠিক কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী, তা নির্ধারণে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।শিশুদের চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব কমাতে ছয় দফা সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।সুপারিশগুলো হলো—১. শিশুবান্ধব সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা: শিশুদের নিরাপদ চলাচল ও সড়ক পারাপার নিশ্চিত করা।২. পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো: শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখানো এবং অভিভাবকদের সতর্ক করা।৩. অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া: আইন প্রয়োগ জোরদার করে ঝুঁকিপূর্ণ যান চালানো প্রতিরোধ করা।৪. জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো: দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের দ্রুত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা।৫. আহত শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন: দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সহায়তার ব্যবস্থা করা।৬. সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর করা: সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু চালকদের সতর্ক করাই যথেষ্ট নয়। সড়কের নকশা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা—এসব ক্ষেত্রেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সাড়ে ৬ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন