রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর: নিরাপত্তা বদলেছে, কিন্তু বিচার অপেক্ষায়
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের সেই ভয়াল সকাল আজও ভুলতে পারেন না দেশের মানুষ। সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক মুহূর্তেই প্রাণ হারান ১১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক। আহত হন কয়েক হাজার মানুষ। দেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে এখনও স্মরণ করা হয়।
ঘটনার দিন সকালে হঠাৎ করেই বহুতল ভবনটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যান সেখানে কাজ করা হাজার হাজার শ্রমিক। উদ্ধারকাজ চলে টানা কয়েক দিন। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ সাধারণ মানুষও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। সেই সময় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল শোক ও উদ্বেগের এক ভারী পরিবেশ।
সরকারি চার্জশিট অনুযায়ী, ভবনের মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের কাজে ঢুকতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে। পরে তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
এই ঘটনায় অবহেলার মাধ্যমে গণহত্যার অভিযোগে ২০১৫ সালে ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। ২০১৬ সালে ঢাকার জেলা জজ আদালতে মামলার বিচার শুরু হয়। তবে বিভিন্ন আসামির হাইকোর্টে আপিল ও স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘ সময় বিচার কার্যক্রম আটকে থাকে।
২০২২ সালের পর আবার বিচার শুরু হলেও মামলার অগ্রগতি খুব ধীর। মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হলেও এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১৪৫ জন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে বারবার নির্দেশ দেওয়া হলেও পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে জানা গেছে। এতে বিচার নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আপিল বিভাগ ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি শেষ করার নির্দেশ দিলেও সেই নির্দেশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নিহতদের পরিবার এবং আহত শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে।
এই মামলার একমাত্র গ্রেফতার আসামি সোহেল রানার আইনজীবী দাবি করেছেন, তার মক্কেল নির্দোষ এবং অন্যায়ভাবে আটক রয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাক্ষী হাজির না হওয়া এবং নানা আইনি জটিলতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে।
রানা প্লাজা ধসের পর দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কারখানায় ভবনের কাঠামো পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে ‘অ্যাকর্ড’ ও ‘অ্যালায়েন্স’ নামে দুটি নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শত শত পোশাক কারখানায় সংস্কার কাজ করা হয়েছে।
এছাড়া সাভার ও আশপাশের এলাকা এখন দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানে হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করেন। তাই রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে আর যেন না ঘটে—সেই বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
তবে আহত শ্রমিকদের অনেকেই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কেউ হারিয়েছেন হাত বা পা, কেউ এখনও মানসিক আঘাত নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ হয়নি।
রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনা দেশের শিল্প নিরাপত্তা নিয়ে বড় একটি সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেছে। একদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এখনও ভুক্তভোগীদের কষ্ট বাড়াচ্ছে। তাই এই ট্র্যাজেডির পূর্ণ বিচার এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের বড় দাবি।