খিলক্ষেতে নির্মাণকাজে ভয়াবহ দুর্ঘটনা: বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৩ শ্রমিক নিহত, আহত ২
রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় নির্মাণকাজ চলাকালীন ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।নির্মাণকাজ চলাকালেই ঘটে দুর্ঘটনারবিবার বিকেলে খিলক্ষেত সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকরা ভবনের লিফটিং কাজের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রী উপরের তলায় তুলছিলেন। এ সময় লোহার রড বা লিফটিংয়ের কোনো অংশ অসাবধানতাবশত উপরের প্রধান বিদ্যুতের লাইনের সঙ্গে স্পর্শ করে।মুহূর্তের মধ্যেই শক্তিশালী বিদ্যুৎ প্রবাহ ওই লোহার কাঠামোর মাধ্যমে শ্রমিকদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।ঘটনাস্থলেই আহত, পরে হাসপাতালে মৃত্যু ঘোষণাদুর্ঘটনার পর আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকি দুইজন শ্রমিক বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।এ ঘটনায় নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও তারা সবাই নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন বলে জানা গেছে।এলাকায় শোক ও আতঙ্কঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খিলক্ষেত এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। অনেকেই এই ধরনের দুর্ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নির্মাণকাজের সময় উপরের বিদ্যুতের লাইনের কাছাকাছি কাজ চললেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।শ্রমজীবী মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তাস্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নিহত শ্রমিকরা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ ও সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের আশায় তারা কাজ করছিলেন। সামনে আসন্ন ঈদকে ঘিরে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্নও ছিল তাদের, যা এই দুর্ঘটনায় এক মুহূর্তে ভেঙে গেছে।একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় এভাবে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।”নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্নএ ঘটনায় নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের মেইন লাইনের কাছাকাছি কাজ করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণস্থলে বিদ্যুতের লাইনের ন্যূনতম নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং কাজ শুরুর আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম উপেক্ষিত হয়।কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের আশ্বাসঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।স্থানীয়রা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগবিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে নির্মাণশিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করা, প্রশিক্ষণের অভাব এবং তদারকির ঘাটতির কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।তারা বলছেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না; বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটবে।উপসংহারখিলক্ষেতের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—নির্মাণকাজে সামান্য অসাবধানতাও হতে পারে প্রাণঘাতী। তিন শ্রমিকের মৃত্যু ও দুইজনের আহত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে আর কোনো পরিবারকে এভাবে অকাল শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।