জুলাই আন্দোলনের অর্জন রক্ষায় নারীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; এটি ছিল সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন। বিশেষ করে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। তবে এখন সেই অবদান অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, সনদ ও গণভোটের রায় এবং এতে নারীদের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ছাত্র পক্ষ। সভায় বিভিন্ন ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। আলোচনায় আন্দোলনের অর্জন, বর্তমান বাস্তবতা এবং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে খোলামেলা কথা উঠে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামসুন্নাহার হলের জিএস সামিয়া মাসুদ মম বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় নারীরা রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, সময় দিয়েছেন, এমনকি জীবন ঝুঁকিতেও ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ধীরে ধীরে সেই জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, সাইবার বুলিং এবং কিছু গণমাধ্যমের দায়িত্বহীন উপস্থাপনা নারীদের পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের অর্জন ধরে রাখতে হলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপদ পরিবেশ না থাকলে ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, কে কার সঙ্গে সমঝোতা করে দেশ চালাচ্ছে, সেটি তাদের প্রধান চিন্তার বিষয় নয়। বরং জুলাই সনদের পক্ষে কে আছে আর কে এর বিরোধিতা করছে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সংসদে অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘৩০০ রান বনাম ১২ রান’ ধরনের তুলনা করা হয়, কিন্তু এই অর্জন কোনো দলের নয়, এটি জনগণের অর্জন। তাই জুলাই সনদের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বিশেষ করে গণভোট-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, সংসদে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব এবং সরাসরি ভোটে নির্বাচনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের মিডিয়ায় অংশগ্রহণ বা নেতৃত্বে আসার পথও সীমিত হয়ে যায়। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোও নারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে তারা মনে করেন।
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিন দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময় বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্দোলনের সূচনা এখান থেকেই হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলন নিয়েও এখানে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে, যা তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্দোলনে নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় এখনো তাদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক কম—এই বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
সব মিলিয়ে বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল জনগণের ঐক্যের প্রতিফলন। এই ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে নারীদের সক্রিয় ও নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্দোলনের অর্জন রক্ষায় সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।