হরমুজ প্রণালিতে রাশিয়ার জন্য টোল মওকুফ: ইরানের নতুন কৌশল
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে রাশিয়ার জন্য টোল মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, “বন্ধুত্বপূর্ণ কিছু দেশের জন্য হরমুজ প্রণালির টোল মওকুফ করা হচ্ছে, যার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে।
তবে কোন কোন দেশকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ তালিকায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি জালালি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান তার কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করেই এই তালিকা নির্ধারণ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। এরই অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা যায়।
পরবর্তীতে ইরান আংশিকভাবে প্রণালিটি খুলে দেয়, তবে শর্ত আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র দেশ ছাড়া অন্য দেশের জাহাজগুলোকে হরমুজ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে একটি নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়—ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত ফি দিতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জন্য টোল মওকুফের সিদ্ধান্তকে অনেকেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম কোনো দেশকে এমন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা ইরান-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও এখানে জানা জরুরি। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাস বলছে, এই প্রণালিকে ঘিরে বহুবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক খারাপ হলে হরমুজ প্রণালি নিয়ে টানাপোড়েন বেড়ে যায়। অতীতে ইরান একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, প্রয়োজনে তারা এই পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়াকে টোল-ফ্রি সুবিধা দেওয়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্তও হতে পারে। এতে একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হবে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের এই পদক্ষেপ শুধু একটি অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলের অংশ। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।