দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আবারও দ্রব্যমূল্য ও বাসভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আবারও দ্রব্যমূল্য ও বাসভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা

প্রতি লিটার ডিজেলে ৯০ টাকা লোকসান বিপিসির, বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলার

তিন মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি

নতুন পে-স্কেলের গেজেট কেন আটকে আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে, জানালেন সংশ্লিষ্টরা

পাচার হওয়া অর্থের ফ্রিজ হিসাব থেকে কর আদায়ে ৭ সদস্যের কমিটি

জামানত ছাড়াই ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, যারা আবেদন করতে পারবেন

স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ল, ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আবারও দ্রব্যমূল্য ও বাসভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আবারও দ্রব্যমূল্য ও বাসভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

একদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি, অন্যদিকে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। পণ্য পরিবহন ও রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হওয়ায় সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম এখনো অধিকাংশ নিত্যপণ্যের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেনি। সোমবার রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে।

এরই মধ্যে যাত্রী পরিবহনে প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। দূরপাল্লার কিছু রুটেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীর বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সোমবার পর্যন্ত বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনা এবং বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের খরচও বাড়বে।

খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, তারা যে দামে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনেন, তার সঙ্গে পরিবহন খরচও যুক্ত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব একদিনে দেখা না গেলেও কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর পণ্যের দামে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।

তবে কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পরিবহন খরচ, পাইকারি দর এবং চাহিদা—সবকিছুর ওপর চূড়ান্ত মূল্য নির্ভর করবে।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

দূরপাল্লার পরিবহনেও এর প্রভাব পড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

হঠাৎ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করা মানুষদের ওপর। দৈনিক কয়েক টাকা বাড়তি খরচ মাস শেষে একটি পরিবারের পরিবহন বাজেটে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে।

রাইডশেয়ারিং সেবাতেও চালকদের কেউ কেউ বাড়তি ভাড়া চাইছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও পিকআপের ভাড়াও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চালকেরা।

নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাত ১২টার পর নতুন দাম কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই কোথাও কোথাও জ্বালানি পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

এ নিয়ে কয়েকটি স্থানে গ্রাহক ও ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানেও জ্বালানি কেনাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, শুধু নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজার ব্যবস্থাপনার কাজ শেষ হয় না। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার সময় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ঠেকাতেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

‘মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না’: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপায়হীন না হলে সরকার এমন ‘অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত’ নিতে চাইত না।

তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি খাতে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় মূল্য ২০৫ টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

তার দাবি, মূল্য সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারত।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের ডিজেলের দামও তুলে ধরেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।

তার বক্তব্য, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সীমান্তপথে তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণেও মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সাধারণ মানুষের ওপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে, সেটিও স্বীকার করেছেন প্রতিমন্ত্রী। দাম বাড়ানোর অভিঘাত সহনীয় রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ। সংস্থাটির ভাড়া সমন্বয় কমিটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা। সেটি বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সিটি বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডিটিসিএ এলাকায় মিনিবাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এগুলো এখনো প্রস্তাবিত হার। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা নয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবকে শুধু পাম্প বা বাসভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল—প্রায় সব ধরনের পণ্যই কোনো না কোনোভাবে পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।

পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বাড়তে পারে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ব্যবসায়ীরা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে ধাপে ধাপে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে একই হারে দাম বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আরেকটি বিষয় হলো, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতে যদি অনুমোদিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু হয়, তাহলে ভোক্তার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হবে। তাই নতুন ভাড়া নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।

  • জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
  • রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি বাস ও লেগুনা ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • দূরপাল্লার কিছু রুটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
  • বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
  • প্রস্তাবিত নতুন বাসভাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে কার্যকর হওয়ার কথা নয়।
  • বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়; তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে ভবিষ্যতে পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ মূলত দুটি জায়গায়—যাতায়াতের খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম। প্রতিদিন যারা বাস, লেগুনা কিংবা রাইডশেয়ারিং ব্যবহার করেন, তাদের জন্য সামান্য ভাড়াবৃদ্ধিও মাসিক ব্যয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এর সঙ্গে যদি পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে, তাহলে একই পরিবারের আয় থেকে যাতায়াত ও বাজার—দুই খাতেই বাড়তি অর্থ বের হয়ে যাবে। তাই মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত ভাড়া ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব বোঝার জন্য শুধু নতুন নির্ধারিত মূল্য দেখলেই হবে না; এর পরের কয়েক সপ্তাহে পরিবহন ভাড়া, পাইকারি বাজারের দর এবং খুচরা দামের গতিপথও নজরে রাখতে হবে। কারণ জ্বালানি একটি পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ায়, আবার পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে অন্য অনেক পণ্যের দামেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিবহন মালিক বা চালক বাড়তি ভাড়া আদায় করলে তা যেন সাধারণ মানুষের ওপর নতুন আর্থিক চাপের কারণ না হয়। একইভাবে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও প্রকৃত পরিবহন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন।

বিষয় : বাসভাড়া বৃদ্ধি ডিজেলের দাম জ্বালানি তেলের নতুন দাম জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আবারও দ্রব্যমূল্য ও বাসভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি, অন্যদিকে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। পণ্য পরিবহন ও রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হওয়ায় সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম এখনো অধিকাংশ নিত্যপণ্যের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেনি। সোমবার রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে।

এরই মধ্যে যাত্রী পরিবহনে প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। দূরপাল্লার কিছু রুটেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীর বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সোমবার পর্যন্ত বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনা এবং বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের খরচও বাড়বে।

খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, তারা যে দামে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনেন, তার সঙ্গে পরিবহন খরচও যুক্ত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব একদিনে দেখা না গেলেও কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর পণ্যের দামে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।

তবে কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পরিবহন খরচ, পাইকারি দর এবং চাহিদা—সবকিছুর ওপর চূড়ান্ত মূল্য নির্ভর করবে।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

দূরপাল্লার পরিবহনেও এর প্রভাব পড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

হঠাৎ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করা মানুষদের ওপর। দৈনিক কয়েক টাকা বাড়তি খরচ মাস শেষে একটি পরিবারের পরিবহন বাজেটে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে।

রাইডশেয়ারিং সেবাতেও চালকদের কেউ কেউ বাড়তি ভাড়া চাইছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও পিকআপের ভাড়াও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চালকেরা।

নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাত ১২টার পর নতুন দাম কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই কোথাও কোথাও জ্বালানি পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

এ নিয়ে কয়েকটি স্থানে গ্রাহক ও ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানেও জ্বালানি কেনাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, শুধু নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজার ব্যবস্থাপনার কাজ শেষ হয় না। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার সময় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ঠেকাতেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

‘মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না’: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপায়হীন না হলে সরকার এমন ‘অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত’ নিতে চাইত না।

তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি খাতে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় মূল্য ২০৫ টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

তার দাবি, মূল্য সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারত।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের ডিজেলের দামও তুলে ধরেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।

তার বক্তব্য, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সীমান্তপথে তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণেও মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সাধারণ মানুষের ওপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে, সেটিও স্বীকার করেছেন প্রতিমন্ত্রী। দাম বাড়ানোর অভিঘাত সহনীয় রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ। সংস্থাটির ভাড়া সমন্বয় কমিটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা। সেটি বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সিটি বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডিটিসিএ এলাকায় মিনিবাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এগুলো এখনো প্রস্তাবিত হার। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা নয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবকে শুধু পাম্প বা বাসভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল—প্রায় সব ধরনের পণ্যই কোনো না কোনোভাবে পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।

পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বাড়তে পারে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ব্যবসায়ীরা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে ধাপে ধাপে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে একই হারে দাম বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আরেকটি বিষয় হলো, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতে যদি অনুমোদিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু হয়, তাহলে ভোক্তার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হবে। তাই নতুন ভাড়া নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।

  • জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
  • রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি বাস ও লেগুনা ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • দূরপাল্লার কিছু রুটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
  • বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
  • প্রস্তাবিত নতুন বাসভাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে কার্যকর হওয়ার কথা নয়।
  • বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়; তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে ভবিষ্যতে পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ মূলত দুটি জায়গায়—যাতায়াতের খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম। প্রতিদিন যারা বাস, লেগুনা কিংবা রাইডশেয়ারিং ব্যবহার করেন, তাদের জন্য সামান্য ভাড়াবৃদ্ধিও মাসিক ব্যয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এর সঙ্গে যদি পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে, তাহলে একই পরিবারের আয় থেকে যাতায়াত ও বাজার—দুই খাতেই বাড়তি অর্থ বের হয়ে যাবে। তাই মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত ভাড়া ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব বোঝার জন্য শুধু নতুন নির্ধারিত মূল্য দেখলেই হবে না; এর পরের কয়েক সপ্তাহে পরিবহন ভাড়া, পাইকারি বাজারের দর এবং খুচরা দামের গতিপথও নজরে রাখতে হবে। কারণ জ্বালানি একটি পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ায়, আবার পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে অন্য অনেক পণ্যের দামেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিবহন মালিক বা চালক বাড়তি ভাড়া আদায় করলে তা যেন সাধারণ মানুষের ওপর নতুন আর্থিক চাপের কারণ না হয়। একইভাবে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও প্রকৃত পরিবহন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর