হাম প্রতিরোধে দুই কোটির বেশি শিশুকে টিকা, অর্জনের হার ১২২ শতাংশ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দুই কোটির বেশি শিশু হামের টিকার আওতায়, দাবি স্বাস্থ্যমন্ত্রীরদেশজুড়ে হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বড় সাফল্যের দাবি করল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত দুই কোটিরও বেশি শিশুকে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, কর্মসূচির অর্জনের হার ইতোমধ্যে ১২২ শতাংশে পৌঁছেছে।[TECHTARANGA-POST:1505]সোমবার দুপুরে কুমিল্লা সদর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুতগতিতে কাজ করছে এবং প্রথম ধাপের টিকাদান কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দেখাতে শুরু করেছে।মন্ত্রী জানান, যেসব এলাকায় আগে সংক্রমণ বেশি ছিল, সেসব উপজেলায় বিশেষ নজর দিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত ১৮টি উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।প্রথম ধাপেই মিলেছে ইতিবাচক ফল?স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার শিশুদের শতভাগ টিকার আওতায় আনতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী ও মাঠপর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে কাজ করেছে। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশু টিকা পেয়েছে। এ কারণেই অর্জনের হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে ১২২ শতাংশে পৌঁছেছে।তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে এত বেশি অর্জনের হার দেখানো হলে প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ, শিশু গণনা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। যদিও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো টিকা না পেলে শিশুদের নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি চালানোকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেকে।“শুধু শাস্তি দিলেই হবে না”সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকটি শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে স্বাধীন তদন্ত চাওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী কিছুটা আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান।তিনি বলেন, “শুধু দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ করা এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো মা সন্তান হারানোর বেদনায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করা।”তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে মানবিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, শিশুমৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।[TECHTARANGA-POST:1476]স্বাস্থ্য খাত বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অতীতে টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুজব, সচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, শুধু টিকা দিলেই হবে না—মানুষের আস্থা ধরে রাখাও এখন বড় বিষয়।ঈদের আগে হাসপাতাল প্রস্তুতি কেমন?এর আগে সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কুমিল্লা মেডিকেল College Hospital এবং কুমিল্লা সদর জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখেন। সামনে ঈদুল আজহা থাকায় হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা কতটা প্রস্তুত, সেটিও পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।পরিদর্শনের সময় তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের খাবারের মান, ওষুধ সরবরাহ পরিস্থিতি এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েও খোঁজ নেন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ঈদের সময় বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।তবে রোগীর স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কিছু ওয়ার্ডে এখনো জনবল সংকট ও বেড স্বল্পতার সমস্যা রয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।কেন বারবার বাড়ছে হাম নিয়ে উদ্বেগ?জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। সেই ঘাটতির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়াও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার গুজবে বিশ্বাস করে শিশুদের টিকা দিতে দেরি করছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে কিছু এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি আবারও বাড়ছে।[TECHTARANGA-POST:1435]মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুর অসুস্থতা নিয়ে পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন শিশু মৃত্যুর খবর সামনে আসে, তখন অনেক অভিভাবক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে আশ্বস্ত করাও।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও সক্রিয় করা গেলে এবং প্রতিটি এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো গেলে হাম নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হতে পারে।পরিদর্শনে যারা ছিলেন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরকালে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রেজা হাসান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. শাহ জাহান, সহকারী পরিচালক ডা. নিশাত সুলতানা, শিশু বিভাগের প্রধান মিয়া মনজুর আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল মালিক, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উৎবাতুল বারী আবু এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।