দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ফার্নেস অয়েলের সংকটের মধ্যে বিকল্প জ্বালানির দিকে আরও জোর দিতে চায় সরকার। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।তিনি বলেছেন, শুধু বড় প্রকল্প নয়, বাড়ির ছাদ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গাসহ যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তার কথাও জানান তিনি।বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনায় বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেডে (বাকেশি) স্থাপিত ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার প্লান্ট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।মন্ত্রী জানান, প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাকেশিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি প্রায় এক মাস আগে উৎপাদনে যায়।এর উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানার নিজস্ব চাহিদার একটি বড় অংশ মেটানো হচ্ছে। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৯০০ কিলোওয়াট। নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।এতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, প্রকল্পটির বিনিয়োগ তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উঠে আসবে।ভবিষ্যতে প্লান্টটির সক্ষমতা ১ মেগাওয়াট থেকে ২ মেগাওয়াটে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।সরকার শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বড় প্রকল্পের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। সাধারণ মানুষকেও এতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাসিক কিস্তিতে ওই ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকবে বলেও জানান তিনি।সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।গুরুত্বপূর্ণ দিক আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য। বাড়ির ছাদ ও প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর পরিকল্পনা। জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার নিশ্চয়তার কথা জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য ১ শতাংশ সুদের ঋণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।মন্ত্রী আরও জানান, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩০ হাজার একর জমি সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও চলছে।ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও এই পরিকল্পনায় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বিটিসিএল, টেলিটক, সাবমেরিন কেবল ও হাইটেক পার্কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জায়গার সুযোগ অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।বাকেশির প্রকল্পটিকে এই পরিকল্পনার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এখানে একই প্রকল্প থেকে কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বড়। কিন্তু লক্ষ্য ঘোষণার পাশাপাশি প্রকল্পগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়ন হচ্ছে, কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কীভাবে যুক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।বিশেষ করে রুফটপ সোলারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অনেক। বড় বড় কারখানা, অফিস, সরকারি ভবন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছাদ দিনের বেশিরভাগ সময় খালি পড়ে থাকে। অর্থাৎ নতুন জমি না কিনেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশের বহু জায়গায় ইতোমধ্যে তৈরি অবকাঠামো রয়েছে। এই জায়গাগুলোকে কাজে লাগানো গেলে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।তবে সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে হলে শুধু প্যানেল বসালেই হবে না। বিনিয়োগের খরচ, ঋণ পাওয়ার সহজতা, যন্ত্রপাতির মান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রির প্রক্রিয়া সহজ হওয়া দরকার। এসব জায়গায় সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আস্থা পেলে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর সুযোগ। কিন্তু প্যানেল বসানোর শুরুতে যে বিনিয়োগ দরকার, সেটিও অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা।তাই ১ শতাংশ সুদের ঋণের উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সহজে পাওয়া যাবে, মাসিক কিস্তি কত হবে এবং উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুতের মূল্য কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ কাগজে সুবিধা থাকলেই হবে না; সাধারণ মানুষের কাছে সেটি সহজলভ্য হওয়াটাই বড় কথা।বাকেশির প্রকল্পে মাসে ১৫ লাখ টাকা সাশ্রয়ের যে দাবি করা হয়েছে, সেটি যদি একই ধরনের অন্য প্রতিষ্ঠানেও বাস্তবে দেখা যায়, তাহলে রুফটপ সোলার নিয়ে বেসরকারি খাতের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।সরকারের পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ—দুই উৎসকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের জায়গা কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।এখন নজর থাকবে ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবে কতটা এগোয় তার ওপর। একই সঙ্গে প্রকল্পের সংখ্যা নয়, কতটা বিদ্যুৎ সত্যিই উৎপাদন হচ্ছে এবং জাতীয় গ্রিডে কতটা যাচ্ছে—এই হিসাবও সামনে আসা দরকার। কারণ শেষ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুতের সাফল্য শুধু কতগুলো প্যানেল বসানো হলো, তা দিয়ে মাপা যাবে না। কতটা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়া গেল, মানুষের খরচ কতটা কমল এবং জ্বালানি সংকটে তা কতটা স্বস্তি দিল—সেটিই হবে আসল হিসাব।

৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের