২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশুর মৃত্যু, হাম পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ
দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে চার শিশুর শরীরে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর বাকি আটজন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৯২ শিশুর শরীরে উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং ১১১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে।শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রোগীর চাপ কিছুটা কমার আভাস মিললেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে উদ্বেগ কাটছে না।চার বিভাগে নতুন মৃত্যু, ঢাকায় উদ্বেগ সবচেয়ে বেশিগত এক দিনে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়া চারজনের দুজন ঢাকা বিভাগের। বাকি দুজনের একজন চট্টগ্রাম এবং অন্যজন বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা বলে জানানো হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত শিশুদের পরিচয় বা নির্দিষ্ট জেলার তথ্য প্রকাশ করেনি।[TECHTARANGA-POST:1266]অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া আট শিশুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। চিকিৎসকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার আগেই রোগীর অবস্থার অবনতি হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে।মার্চের পর থেকে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাসরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪ শিশুর শরীরে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছিল। আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৭৭ জন।একই সময়ে সারা দেশে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজার ১৭৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। যদিও চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৪১৬ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকে মনে করছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক পরিবার এখনো হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছে।ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে হামের লক্ষণ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৫০ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবহুল এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মানুষের ঘনবসতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং টিকাদানে অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, “অনেক অভিভাবক প্রথম দিকে জ্বর বা শরীরের ফুসকুড়িকে সাধারণ সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেন না। পরে শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে তখন রোগীকে হাসপাতালে আনা হয়।”হাসপাতালগুলোতে এখনো চাপস্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও হাসপাতালগুলোতে চাপ এখনো রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বাড়তি শয্যা ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।[TECHTARANGA-POST:1241]রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক শিশু জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে দানা ওঠার মতো উপসর্গ নিয়ে আসছে। এর মধ্যে কারও কারও শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে।তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ বিভিন্ন জেলায় নজরদারি জোরদার করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ টিমও কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।টিকা নিয়ে সচেতনতার ঘাটতির অভিযোগজনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, হাম পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি বড় কারণ হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতার অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা পায়নি। আবার কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে ভুল ধারণাও রয়েছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কিন্তু সব শিশু টিকার আওতায় না এলে সংক্রমণ থামানো কঠিন।”সামাজিক প্রভাবও বাড়ছেহামের এই দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সামাজিক চাপও বাড়িয়ে তুলছে। হাসপাতালে শিশু ভর্তি বাড়ায় অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। নিম্নআয়ের অভিভাবকদের অনেকে কাজ ফেলে দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।গ্রামের কিছু এলাকায় আতঙ্কের কারণে শিশুদের স্কুলে পাঠানো কমে গেছে বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রমণ চলতে থাকলে শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তবে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে নতুন কোনো জরুরি বিধিনিষেধ বা বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়নি।পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শচিকিৎসকরা শিশুদের জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানো হতে পারে। যদিও মাঠপর্যায়ে চিকিৎসাসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন রয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1251]
বর্তমানে রোগী ভর্তির চাপ কিছুটা কমলেও মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় উদ্বেগ কাটছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান জোরদার এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।