দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

কান উৎসবে বড় চমক: বিদেশি সিনেমার শুটিং টানতে ৬০ শতাংশ ক্যাশ রিবেট দেবে সৌদি আরব

মধ্যপ্রাচ্যে চলচ্চিত্র শিল্পের নতুন কেন্দ্র হতে এবার আরও বড় পদক্ষেপ নিল Saudi Arabia। আন্তর্জাতিক প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে দেশটি সিনেমার শুটিংয়ে দেওয়া নগদ প্রণোদনা বা ক্যাশ রিবেট ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করেছে। বিশ্বের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এটি এখন অন্যতম বড় আর্থিক সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।ফ্রান্সের Cannes Film Festival-এ সৌদি ফিল্ম কমিশনের এই ঘোষণার পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হলিউডসহ বড় বড় স্টুডিওকে নিজেদের দেশে টানতেই এমন উচ্চমাত্রার আর্থিক ছাড় দিচ্ছে রিয়াদ।কী এই ক্যাশ রিবেট, কেন এত গুরুত্বপূর্ণচলচ্চিত্র শিল্পে ক্যাশ রিবেট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট দেশে শুটিং করে স্থানীয়ভাবে যে অর্থ ব্যয় করে, তার একটি বড় অংশ সরকার পরে ফেরত দেয়। এটি অনেকটা বিনিয়োগের বিপরীতে নগদ প্রণোদনার মতো।[TECHTARANGA-POST:1331]ধরা যাক, একটি আন্তর্জাতিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে শুটিং করতে গিয়ে হোটেল, পরিবহন, সেট নির্মাণ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি সেবা, স্থানীয় শিল্পী ও কর্মীদের পেছনে ১ কোটি ডলার ব্যয় করল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সেই খরচের ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ৬০ লাখ ডলার ফেরত পেতে পারে তারা।চলচ্চিত্র অর্থনীতির সঙ্গে জড়িতদের মতে, এমন সুযোগ নির্মাতাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। কারণ বড় বাজেটের সিনেমায় লোকেশন খরচ কমানো এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।হলিউডকে টানার নতুন কৌশল?সৌদি আরব কয়েক বছর ধরেই বিনোদন খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। সংগীত, কনসার্ট, ক্রীড়া আয়োজনের পর এবার চলচ্চিত্র শিল্পেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে দেশটি। নতুন রিবেট নীতিকে সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।সৌদি ফিল্ম কমিশনের প্রধান আবদুল্লাহ বিন নাসের আল-কাহতানি বলেছেন, দেশটিতে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবেশ তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, নির্মাতারা যেন প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই দ্রুত কাজ করতে পারেন, সে জন্য নতুন আর্থিক ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।তিনি জানান, শুধু প্রণোদনা বাড়ানো নয়, বরং অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াও দ্রুত করা হবে। এতে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিতে বড় বাজেটের প্রকল্প সৌদিতে আনতে আগ্রহী হবে।মরুভূমি থেকে ঐতিহাসিক নগরী, লোকেশনেও নজরগত কয়েক বছরে Al-Ula আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের কাছে বিশেষ আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠেছে। ইউনেসকো ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী এই অঞ্চল, বিস্তীর্ণ মরুভূমি, পাহাড়ি এলাকা ও প্রাচীন স্থাপত্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে ব্যবহার হয়েছে।বিশেষ করে অ্যাকশন, যুদ্ধভিত্তিক ও ঐতিহাসিক সিনেমার জন্য সৌদির প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপযোগী মনে করছেন নির্মাতারা। এর আগে Kandahar সিনেমার শুটিংও দেশটিতে হয়েছে। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন Gerard Butler।চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এখন রিবেট ৬০ শতাংশ হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও বড় বাজেটের আন্তর্জাতিক সিনেমা সৌদিতে শুটিং হতে পারে।স্থানীয় অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারেসিনেমার শুটিং শুধু বিনোদন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পর্যটন, হোটেল ব্যবসা, পরিবহন, প্রযুক্তি সেবা, নির্মাণ ও নিরাপত্তাসহ নানা খাত।একটি বড় আন্তর্জাতিক সিনেমার শুটিংয়ে শত শত স্থানীয় মানুষ কাজের সুযোগ পান। কেউ সেট নির্মাণে যুক্ত হন, কেউ যানবাহন পরিচালনা করেন, আবার কেউ কাজ করেন মেকআপ, ক্যাটারিং বা নিরাপত্তা টিমে।[TECHTARANGA-POST:1313]বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি সৌদি আরবের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছে দেশটির নতুন ইমেজও তৈরি হবে।কারণ, জনপ্রিয় সিনেমায় কোনো লোকেশন দেখানো হলে সেই জায়গায় পর্যটকের আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। এর আগে নিউজিল্যান্ডে The Lord of the Rings কিংবা ক্রোয়েশিয়ায় Game of Thrones সিরিজের শুটিংয়ের পর পর্যটন খাতে বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।সমালোচনাও আছেতবে সৌদি আরবের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন দাবি করছে, বিনোদন ও ক্রীড়া খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পাল্টানোর চেষ্টা করছে।যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব সমালোচনা সরাসরি স্বীকার করেনি। তাদের দাবি, দেশটিকে বহুমাত্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে সংস্কৃতি ও বিনোদন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিলেই হবে না; আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, সৃজনশীল স্বাধীনতা ও আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রতিযোগিতাবিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন আন্তর্জাতিক সিনেমার শুটিং নিজেদের দেশে আনতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, মরক্কো ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলো আগে থেকেই আকর্ষণীয় রিবেট সুবিধা দিয়ে আসছে।এ অবস্থায় সৌদি আরবের ৬০ শতাংশ রিবেট ঘোষণাকে অনেকেই “গেম চেঞ্জার” হিসেবে দেখছেন। কারণ, এত উচ্চ হারে নগদ ফেরত আন্তর্জাতিক বাজারে খুব কম দেশই দেয়।বিশেষ করে হলিউড ও বড় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো যখন ক্রমাগত নতুন লোকেশন খুঁজছে, তখন সৌদি আরব সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।সামনে কী হতে পারেচলচ্চিত্র শিল্পে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সৌদি আরব যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, নতুন এই ঘোষণা তারই বড় ইঙ্গিত। আগামী কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক স্টুডিওগুলোর বড় বড় প্রকল্প সৌদিতে গেলে দেশটির বিনোদন ও পর্যটন খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1325] তবে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নির্মাতারা কত দ্রুত অর্থ ফেরত পান, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কতটা সহজ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি কতটা বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে—সেই দিকেই এখন নজর চলচ্চিত্র অঙ্গনের।

কান উৎসবে বড় চমক: বিদেশি সিনেমার শুটিং টানতে ৬০ শতাংশ ক্যাশ রিবেট দেবে সৌদি আরব