দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অগ্রদূত সেলিমা আহমাদ আর নেই, রেখে গেলেন অনুপ্রেরণার এক ইতিহাস

দেশের নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ আর নেই। থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।ব্যবসা, নারী নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বাংলাদেশে যে কয়েকজন মানুষের নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়, সেলিমা আহমাদ ছিলেন তাদের একজন। বিশেষ করে হাজার হাজার নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড় করানোর যে আন্দোলন তিনি শুরু করেছিলেন, সেটিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় এনে দেয়।[TECHTARANGA-POST:1630]পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন। তার মৃত্যুতে ব্যবসায়ী মহল, নারী উদ্যোক্তা সমাজ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।ব্যবসায়িক নেতৃত্ব থেকে জাতীয় পরিচিতি১৯৬০ সালের ৭ জুলাই জন্মগ্রহণকারী সেলিমা আহমাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে জাপান, ডেনমার্ক, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোশিপ লাভ করেন।তিনি দেশের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। অটোমোবাইল, সিমেন্ট, কাগজ, রিয়েল এস্টেট, আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত এই শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান মাতলুব আহমাদের সহধর্মিণী ছিলেন তিনি।নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছিলেনসেলিমা আহমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠা। ২০০১ সালে তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগঠন দেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম জাতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পায়।তার নেতৃত্বে হাজার হাজার নারী প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, বাজারসংযোগ ও ব্যবসায়িক পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নারীদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক নারী প্রথমবারের মতো ব্যবসা শুরু করার সাহস পেয়েছিলেন সেলিমা আহমাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ও পরামর্শ থেকে।ব্যাংকিং খাত ও নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকাশুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতেও সক্রিয় ছিলেন সেলিমা আহমাদ। তিনি জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছেন।অর্থনীতিবিদদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। ব্যবসা ও অর্থনীতির বিভিন্ন ফোরামে তিনি নারী অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছেন।রাজনীতিতেও ছিল সক্রিয় উপস্থিতিব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও যুক্ত হন সেলিমা আহমাদ। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।[TECHTARANGA-POST:1612]সংসদে তিনি নারী উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুখসেলিমা আহমাদের কর্মজীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি আসে ২০১৪ সালে। সে বছর তিনি অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। ব্যবসার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন ও ইতিবাচক প্রভাব তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বেস্ট বিজনেস উইমেন, প্রিয়দর্শিনী এবং বিজনেস এক্সপ্রেস অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।কেন তার মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা আন্দোলন আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার পেছনে কয়েকজন পথপ্রদর্শকের অবদান রয়েছে। সেলিমা আহমাদ ছিলেন সেই অগ্রগামীদের অন্যতম।তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে তিনি শুধু প্রশিক্ষণ দেননি, বরং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরজাও খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে নারীদের ব্যবসায়িক অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো অর্থায়ন, বাজারসংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেলিমা আহমাদের মতো নেতৃত্বের অভাব ভবিষ্যতে আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণবাংলাদেশের ব্যবসায়িক ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন, যারা একই সঙ্গে করপোরেট নেতৃত্ব, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সেলিমা আহমাদ সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি চারটি ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন।গুরুত্বপূর্ণ দিক• বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নারী বাণিজ্য সংগঠন বিডব্লিউসিসিআই প্রতিষ্ঠা করেন[TECHTARANGA-POST:1619]• হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ ও ব্যবসায়িক সহায়তার সুযোগ করে দেন• নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে শিল্প খাতে নেতৃত্ব দেন• আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেনসাধারণ মানুষের ভাবনাবাংলাদেশে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা যখন বলা হয়, তখন শুধু নীতিমালা নয়, প্রয়োজন হয় বাস্তব নেতৃত্বের। সেলিমা আহমাদের জীবন দেখিয়েছে—একজন মানুষের উদ্যোগ হাজারো মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। তার মৃত্যুতে অনেকেই মনে করছেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য শুরু করা কাজগুলো আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে সেটিই হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অগ্রদূত সেলিমা আহমাদ আর নেই, রেখে গেলেন অনুপ্রেরণার এক ইতিহাস