ভিসা জটিলতায় স্থবির বেনাপোল, যাত্রী কমে বিপাকে সীমান্ত অর্থনীতি
দেশের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর বেনাপোলে এখন আর আগের মতো যাত্রীদের ভিড় দেখা যায় না। একসময় যেখানে সকাল থেকেই ইমিগ্রেশন কাউন্টার, ট্রাভেল এজেন্সি ও টার্মিনাল এলাকায় ছিল মানুষের কোলাহল, সেখানে এখন নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা।ভারতের ভ্রমণ ভিসায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিধিনিষেধের কারণে যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রায় নয় মাস ধরে চলা এই সংকটের কারণে সীমান্তকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও সেবা খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।[TECHTARANGA-POST:1308]যাত্রী সংখ্যা নেমেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়েসর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ২৪ ঘণ্টায় বেনাপোল আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করেছেন মাত্র ৭২৫ জন যাত্রী। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যস্ততম এই স্থলবন্দরের জন্য এ সংখ্যা অত্যন্ত কম।কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, ওই সময়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ছিলেন ৫৭৪ জন, ভারতীয় নাগরিক ১৫০ জন এবং অন্য দেশের নাগরিক ছিলেন মাত্র একজন।একসময় প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পুরো বন্দর এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর থেকেই ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়তে শুরু করে। যদিও সীমিত আকারে মেডিকেল ভিসা চালু রয়েছে, তবে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।এর ফলে চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভারত যেতে ইচ্ছুক অনেক মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকে অভিযোগ করছেন, জরুরি প্রয়োজন থাকলেও সময়মতো ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না।ধস নেমেছে সেবা খাতেযাত্রী সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেনাপোলকেন্দ্রিক সেবা খাতে। ট্রাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ ও আবাসিক হোটেলগুলোতে এখন আগের মতো গ্রাহক নেই। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।স্থানীয় কয়েকজন হোটেল মালিক জানান, আগে প্রতিদিন অধিকাংশ কক্ষ বুকড থাকলেও এখন দিনের পর দিন খালি পড়ে থাকে। একই অবস্থা ট্রাভেল এজেন্সি ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোরও।পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংকটঢাকা-বেনাপোল রুটে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসগুলোও পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছে না। এতে পরিবহন শ্রমিক, কাউন্টার স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের আয় কমে গেছে।অন্যদিকে, স্টেশন ও টার্মিনাল এলাকায় ছোট দোকান, খাবারের হোটেল এবং ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের দাবি, বেচাকেনা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।দ্রুত সমাধানের দাবিবেনাপোল স্থলবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে ভিসা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক বলেন, দীর্ঘদিন ভ্রমণ ভিসা স্বাভাবিক না থাকলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, দুই দেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।এদিকে বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারত সরকারের দ্রুত ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করা প্রয়োজন।সীমান্ত অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের শঙ্কাবিশ্লেষকদের মতে, বেনাপোল শুধু একটি স্থলবন্দর নয়; এটি সীমান্তকেন্দ্রিক বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। যাত্রী চলাচল কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।[TECHTARANGA-POST:1308]তারা বলছেন, ভিসা জট দ্রুত সমাধান না হলে সীমান্ত এলাকার হাজারো মানুষের জীবিকা আরও সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগেও দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বেনাপোলকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।