উখিয়া সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে গোলাগুলি, জি-থ্রি রাইফেল ও ৪ হাজার ইয়াবা উদ্ধার
কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে সশস্ত্র একটি দলের গোলাগুলির ঘটনা নতুন করে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা নাফ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মিয়ানমারের দিকে পালিয়ে গেলেও তাদের ফেলে যাওয়া নৌকা থেকে একটি জি-থ্রি রাইফেল, শত শত রাউন্ড গুলি এবং ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে, এ ঘটনাকে তারই একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৩ জুন) দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে ৬৪ বিজিবির পালংখালী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ বাহারপাড়া সংলগ্ন নাফ নদী এলাকায় নিয়মিত টহল চলছিল। এ সময় মিয়ানমার সীমান্তের দিক থেকে একটি নৌকায় কয়েকজন ব্যক্তিকে জেলের ছদ্মবেশে আসতে দেখা যায়। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল দ্রুত সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করে।[TECHTARANGA-POST:1539]সন্দেহজনক নৌকা ঘিরতেই শুরু হয় গুলিবিজিবির দাবি, টহল দল নৌকার কাছে পৌঁছালে সেখানে থাকা সশস্ত্র ব্যক্তিরা হঠাৎ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে বিজিবিও পাল্টা জবাব দেয়। কয়েক মিনিটের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর সশস্ত্র ব্যক্তিরা নৌকাটি ফেলে নাফ নদীতে ঝাঁপ দেয় এবং সাঁতরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পালিয়ে যায়।ঘটনার সময় সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় বিজিবির কোনো সদস্য হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।নৌকা তল্লাশিতে মিলল অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবাদুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া নৌকাটি জব্দ করে তল্লাশি চালায় বিজিবি। তল্লাশিতে উদ্ধার করা হয় একটি জি-থ্রি রাইফেল, তিনটি খালি জি-থ্রি ম্যাগাজিন, তিনটি ফাইবার ম্যাগাজিন এবং ৫১৫ রাউন্ড গুলি।এছাড়া উদ্ধার করা হয় ৪ হাজার পিস ইয়াবা, একটি সিম্ফনি বাটন মোবাইল ফোন, দুটি এয়ারটেল সিম, একটি জি-থ্রি পাউচ, দুটি লুঙ্গি, একটি কলার গেঞ্জি, নগদ ২০ টাকা এবং ১২ প্যাকেট মারিস সিগারেট।বিজিবির ধারণা, অস্ত্র ও মাদকের এই চালান সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের উদ্দেশ্যেই আনা হচ্ছিল। তবে চূড়ান্ত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।আগের ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজছে বিজিবিগোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি বলছে, গত ৩০ মে হ্নীলা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ কাব্যিক চর এলাকায় জেলে বেশধারী কয়েকজন রোহিঙ্গার কাছ থেকে ইয়াবা ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে সশস্ত্র চক্রের নাম উঠে এসেছিল, বর্তমান ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।তবে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। উদ্ধার হওয়া আলামত, গোয়েন্দা তথ্য এবং সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন সূত্র যাচাই করে পুরো ঘটনার পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্তের চেষ্টা চলছে।সীমান্তে কেন বাড়ছে ঝুঁকি?কক্সবাজার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের চলাচলের জন্য আলোচিত। বিশেষ করে নাফ নদীকে ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে মাদক ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য আনার অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় চক্রগুলো প্রায়ই নিজেদের পরিচয় গোপন করতে জেলে বা সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশ ব্যবহার করে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, স্থানীয় যুবসমাজের জন্যও বড় হুমকি। ইয়াবার সহজলভ্যতা তরুণদের বিপথে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।বিজিবির অবস্থানএ বিষয়ে বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় মাদক, অস্ত্র এবং চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবাসী এবং জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সীমান্তে এমন অভিযান অব্যাহত থাকলে চোরাচালান চক্রের কার্যক্রম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি।