দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

সাতক্ষীরায় কারাবন্দি সাবেক পিপি আব্দুল লতিফের মৃত্যু, হাসপাতালে নেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস

কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু সাবেক পিপিরসাতক্ষীরা জেলা জজকোর্টের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল লতিফের মৃত্যু ঘিরে জেলায় নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনটি হত্যা মামলায় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় সোমবার (২৫ মে) ভোরে তিনি মারা যান। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।[TECHTARANGA-POST:1502]ভোররাতের এই মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আইনজীবী মহলেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কারণ, বিতর্কিত হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সাতক্ষীরা আদালতপাড়ায় পরিচিত মুখ ছিলেন আব্দুল লতিফ।রাত ৩টায় অসুস্থতা, এক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুসাতক্ষীরা জেলা কারাগারের জেলার দুলাল কর্মকার জানিয়েছেন, সোমবার রাত ৩টার দিকে কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুল লতিফ। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুর রহমান বলেন, “রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে বুকে ব্যথাজনিত সমস্যা নিয়ে তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসা শুরু করার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো বিষয়টি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটে যায়। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি বিতর্কও ছিলআব্দুল লতিফ সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামার বায়সা গ্রামের মৃত মুনসুর সরদারের ছেলে। তিনি আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন।আইন পেশায় তার দীর্ঘ উপস্থিতি থাকলেও তাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাতক্ষীরা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহম্মেদ রবির সুপারিশে তিনি জেলা জজ আদালতের পিপি হিসেবে নিয়োগ পান।ওই সময় তার নিয়োগ নিয়ে আদালতপাড়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। কয়েকজন আইনজীবী তার বিরুদ্ধে কর্মসূচিও পালন করেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগও ছিলআব্দুল লতিফকে নিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, অর্থনৈতিক নানা অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত ছিল। অভিযোগ উঠেছিল, দায়িত্ব পালনকালে আদালতপাড়া নিয়ন্ত্রণ, ভারতীয় গরুর খাটাল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রভাবভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন।যদিও এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, তার বিরুদ্ধে ওঠা বেশ কিছু অভিযোগ তদন্তাধীন ছিল।[TECHTARANGA-POST:1502]স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জেলা পর্যায়ের রাজনীতি ও আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আব্দুল লতিফকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও সেই বড় বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বদলে যায় পরিস্থিতি২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধেও আটটি হত্যা ও নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়।তার ছেলে রাসেলের বিরুদ্ধেও তিনটি মামলা হয়। মামলা হওয়ার পর বাবা-ছেলে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।নিহতের মেয়ে শাম্মি জানান, ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর খুলনার বয়রা এলাকা থেকে পুলিশ তার বাবা ও ভাইকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের পর থেকেই তিনি মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।মৃত্যুর পর যা বলছে প্রশাসনসাতক্ষীরা সদর থানার ওসি মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পুরো প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে। তবে কারাগারে থাকা কোনো বন্দির মৃত্যু হলে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জনমনে কৌতূহল আরও বেশি তৈরি হয়।এমন পরিস্থিতিতে মানবাধিকার কর্মীদের একটি অংশ বলছেন, কারাগারে বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা জরুরি। কারণ, দেশে প্রায়ই অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেক প্রতিচ্ছবিআব্দুল লতিফের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়—এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।একসময় ক্ষমতাধর হিসেবে পরিচিত অনেক ব্যক্তিই রাজনৈতিক পালাবদলের পর হঠাৎ করেই আইনি ও সামাজিক চাপে পড়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিও সামনে আসছে।[TECHTARANGA-POST:1474]তবে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত যেই হোক না কেন, অভিযোগ থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে একজন বন্দির মৌলিক চিকিৎসা অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আব্দুল লতিফের মৃত্যু সেই দুই বাস্তবতাকেই আবার নতুন করে সামনে এনে দিল।

সাতক্ষীরায় কারাবন্দি সাবেক পিপি আব্দুল লতিফের মৃত্যু, হাসপাতালে নেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস