পঞ্চগড় সীমান্তে ৩৮ ঘণ্টা ধরে আটকা ১০ জন, তৃষ্ণায় কাঁদছে তিন শিশু
ভাই, আমার বাচ্চার জন্য একটু পানি দেন, টাকা দিচ্ছি’—পঞ্চগড় সীমান্তের জিরো লাইনে দাঁড়িয়ে এক অসহায় বাবার এই আকুতি যেন পুরো পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতাকে চোখের সামনে তুলে ধরে। পাশে থাকা শিশুটি তখন তৃষ্ণায় কাঁদছিল। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে টানা ৩৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকে রয়েছেন ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে তিনটি শিশু, যারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে।[TECHTARANGA-POST:1573]শনিবার পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্ত এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জিরো লাইনের ভারতীয় অংশে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন ওই ১০ জন। কোনো স্থায়ী আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই তাদের জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবারগুলো চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে সীমান্তআটকে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স প্রায় ছয় বছর এবং আরেক শিশুর বয়স নয় বছর। প্রচণ্ড গরম, ক্ষুধা এবং পানির অভাবে তারা বারবার পানি চাইছে। শিশুদের কান্না থামাতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন বাবা-মায়েরা।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতভর ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা জায়গায় অবস্থান করতে হয়েছে তাদের। কোনো ধরনের নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় ভিজে অবস্থাতেই রাত কাটাতে হয়েছে নারী ও শিশুদের।আটকে থাকা এক ব্যক্তি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ায় একপর্যায়ে শিশুরা বৃষ্টির পানি এবং আশপাশে জমে থাকা ডোবার পানি পান করতে বাধ্য হয়েছে। এতে তাদের অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।কীভাবে তৈরি হলো এই পরিস্থিতি?স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, শুক্রবার ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) তাদের গ্রহণে আপত্তি জানালে তারা সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকে পড়ে।এরপর থেকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন তারা। বাংলাদেশ পক্ষ থেকে বিষয়টিকে অবৈধ পুশ ইন হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষও তাদের নিজ ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।[TECHTARANGA-POST:1545]ফলে কয়েক ঘণ্টার বিষয়টি ধীরে ধীরে কয়েক দিনে গড়িয়েছে, আর সেই সময়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের।পতাকা বৈঠকেও মেলেনি সমাধানঘটনার বিষয়ে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বড়বাড়ি সীমান্তে বিএসএফ ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বর্তমানে তারা ভারতের অভ্যন্তরে ভারতীয় ভূখণ্ডেই অবস্থান করছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের পুশ ইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবির নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।মানবিক প্রশ্নের সামনে প্রশাসনিক জটিলতাসীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে পরিচয়, নাগরিকত্ব বা অবস্থানগত জটিলতার কারণে মানুষকে সীমান্তে আটকে থাকার ঘটনা সামনে এসেছে। তবে শিশু ও নারীদের দীর্ঘ সময় ধরে এমন অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে হওয়া মানবাধিকার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইনগত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিশুদের খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক নীতির অংশ। যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিরীহ শিশু ও সাধারণ মানুষ।[TECHTARANGA-POST:1530]স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না কোনো সীমান্ত মানে না। তাই দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।৩৮ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো অনিশ্চয়তার অবসান হয়নি। খোলা আকাশের নিচে থাকা ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু অপেক্ষা করছেন এমন একটি সিদ্ধান্তের, যা তাদের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে পারে।