দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

রামপালে ঝুঁকিপূর্ণ ১৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়, আতঙ্কে ১ হাজার ৭৭০ শিশু

মাথার ওপর জরাজীর্ণ ছাদ। কোথাও খসে পড়ছে সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ, আবার কোথাও বেরিয়ে এসেছে মরিচাধরা রড। দেয়াল ও পিলারে বড় বড় ফাটল। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় শ্রেণিকক্ষের মেঝে, বই-খাতা।এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই প্রতিদিন ক্লাস করছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ হাজার ৭৭০ শিক্ষার্থী। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাবে, বিদ্যালয়গুলোকে ‘অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।সরেজমিনে মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির ভবনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চারপাশে পানি জমে আছে। ভবনে প্রয়োজনীয় দরজা-জানালার সংকট রয়েছে। পিলার ও দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। ছাদ থেকেও খসে পড়ছে পলেস্তারা।বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষের ভেতর পানি পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায় এবং পাঠদান ব্যাহত হয়।উপজেলার আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই। কোথাও জরাজীর্ণ ভবনের ভেতরেই চলছে ক্লাস, আবার কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পাশে বিকল্প ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে।স্থায়ী ভবন না থাকায় কোনো কোনো বিদ্যালয়ে টিন বা গোলপাতার অস্থায়ী ঘরেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। গরমে টিনের ঘর অসহনীয় হয়ে ওঠে। বর্ষায় আবার শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে।রামপাল উপজেলায় মোট ১২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।বিদ্যালয়গুলো হলো—দ্বিজবর মল্লিক মেমোরিয়াল হাতীরবেড় সুলতানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সগুনা দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তালবুনিয়া উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বাঁশতলী উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বি.এস. কুইন্টন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বর্নি ছায়রাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সন্নাসী তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রনসেন আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতকাটা-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলপুকুরিয়া পেড়িখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধলদাহ হাজী সাহেব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরম্ভা দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভৈরবডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরম্ভ পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামাবাদ দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড় নবাবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।এসব বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাওলাদার জাকির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে জোড়াতালি দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে।তিনি বলেন, ‘শিশুদের পড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। ভবনটি দ্রুত অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরি।’বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহুল দাস বলে, ‘আমাদের স্কুলের ভবন অনেক নষ্ট হয়ে গেছে। ছাদ থেকে প্রায়ই বালু ও সিমেন্টের গুঁড়া খসে পড়ে। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, মাঠেও পানি জমে থাকে। আমরা ভয় নিয়ে ক্লাস করি। নতুন ভবন হলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব।’আরেক শিক্ষার্থী শামিমা খাতুন জানায়, গরমের সময় টিনের ঘরের ভেতরে প্রচণ্ড গরম লাগে। বৃষ্টির সময়ও নানা সমস্যা হয়। নিরাপদ নতুন ভবনের দাবি জানিয়েছে সে।ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও। মুজিবনগর চর এলাকার অভিভাবক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।তার ভাষ্য, ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে এবং বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢোকে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।আরেক অভিভাবক মোছা. রেহানা বেগম বলেন, বৃষ্টি বা ঝড়ের সময় পুরোনো ভবন নিয়ে ভয় আরও বেড়ে যায়। তাঁর সন্তানও স্কুলের সমস্যার কথা বাড়িতে বলে। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান তিনি।শুধু শ্রেণিকক্ষের ভবন নয়, দীর্ঘদিন মাঠে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।রামপাল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার জানান, তিনি সম্প্রতি উপজেলায় যোগদানের পর বিভিন্ন বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের ভিত্তিতে ১৯টি বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।তিনি বলেন, এসব বিদ্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয়দের সহযোগিতায় গোলপাতার ঘরে বিকল্পভাবে পাঠদান চলছে।সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার অর্থ শুধু পাঠ্যবই পড়া নয়—নিরাপদ পরিবেশে শেখা, খেলাধুলা ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া। সেখানে ছাদ ধসে পড়ার আশঙ্কা, দেয়ালে ফাটল কিংবা বৃষ্টিতে শ্রেণিকক্ষ ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তাকেও সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে।শিশুদের জন্য নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ কোনো বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে দ্রুত কারিগরি মূল্যায়ন, অস্থায়ী নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ এবং স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশও স্বাভাবিক করা সম্ভব।এখানে সমস্যা শুধু পুরোনো ভবন নয়; দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোয় শিক্ষা কার্যক্রম চললে উপস্থিতি, মনোযোগ ও শিশুদের মানসিক স্বস্তির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাই নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ও অস্থায়ী নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

রামপালে ঝুঁকিপূর্ণ ১৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়, আতঙ্কে ১ হাজার ৭৭০ শিশু