দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

রাজন-রাকিবের মতো রামিসার বিচারও কি হারিয়ে যাবে উচ্চ আদালতে!

রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় মাত্র ছয় কার্যদিবসে হওয়ায় দেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিচারিক আদালতের এই দ্রুত পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক নজির হিসেবে দেখছেন। তবে একই সঙ্গে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকার যে প্রবণতা, রামিসা মামলার ক্ষেত্রেও কি সেটিই ঘটবে? অতীতের কয়েকটি আলোচিত শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মামলার দিকে তাকালে সেই আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিশু রাজন, শিশু রাকিব এবং মাগুরার শিশু আছিয়ার মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিচার শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা দ্রুত চূড়ান্ত ও কার্যকর করার বিষয়টি। [TECHTARANGA-POST:1594] রাজন ও রাকিব মামলার দীর্ঘ অপেক্ষা সিলেটের রাজন হত্যাকাণ্ড ছিল এমন একটি ঘটনা, যা ২০১৫ সালে দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এক কিশোরকে ঘিরে সংঘটিত নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য জনসমক্ষে আসার পর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের বিস্তর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ঘটনাটি জাতীয় আলোচনায় পরিণত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। এর ফল হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই মামলার বিচার সম্পন্ন হয় এবং ১৭ কার্যদিবসে আদালত রায় প্রদান করেন। একই বছর খুলনায় মোটর গ্যারেজ কর্মী শিশু রাকিবকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার ঘটনায়ও দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মাত্র ১০ কার্যদিবসে মামলার বিচার সম্পন্ন করে আদালত রায় ঘোষণা করেন। দুই মামলাই পরে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হলেও সেখান থেকে আপিল বিভাগে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিলম্বিত হলে শুধু ভুক্তভোগী পরিবার নয়, পুরো সমাজের মধ্যেই বিচারব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আছিয়া মামলাও একই পথে? গত বছর মাগুরার আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে দ্রুত রায় হলেও মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ কারণে মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের অনেকেই মনে করছেন, শুধু দ্রুত রায় নয়, আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ বেঞ্চ নিয়ে নতুন আশা রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বহু আলোচিত মামলার রায় হলেও কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। তাই আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও দ্রুত করা জরুরি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে রামিসা হত্যা মামলার বিচার তিন মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, দেশের প্রতিটি মামলাকে একই ধরনের অগ্রাধিকার দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবু বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত করার পথ খুঁজছে সরকার। বিচার দৃশ্যমান হতে হবে’ বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এলিনা খান মনে করেন, উচ্চ আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিশেষ বেঞ্চ সময়ের দাবি ছিল। তার ভাষায়, বিচার শুধু আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মানুষকে সেটি বাস্তবেও দেখতে হবে। অপরাধীর সাজা কার্যকর হয়েছে—এই বার্তাটি সমাজে পৌঁছানো জরুরি। এলিনা খানের মতে, স্পর্শকাতর অপরাধের মামলাগুলো দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকলে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এজন্য তিনি দ্রুত নিষ্পত্তি ও কার্যকর শাস্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং সমাজে ইতিবাচক বার্তা যাবে। তার মতে, দ্রুত পেপারবুক প্রস্তুত, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং বিশেষ বেঞ্চের কার্যকর তৎপরতা থাকলে রামিসা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। কেন গুরুত্বপূর্ণ দ্রুত বিচার? আইন ও সমাজবিজ্ঞান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের নিরাপত্তাবোধকে আঘাত করে। যখন কোনো আলোচিত মামলার বিচার দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকে, তখন মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অপরদিকে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার অপরাধীদের জন্য শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করিয়ে দেন যে, দ্রুত বিচার মানেই তাড়াহুড়া নয়। বিচার অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত হতে হবে। একই সঙ্গে আপিলের সাংবিধানিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এখন সবার চোখ রামিসা মামলার দিকে রামিসা হত্যা মামলার রায় বিচারিক আদালতে রেকর্ড সময়ের মধ্যে হয়েছে। কিন্তু এই মামলাটি এখন একটি বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ দেশের মানুষ শুধু দ্রুত রায় নয়, দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও দেখতে চায়। রাজন, রাকিব ও আছিয়ার মামলার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এবার উচ্চ আদালতেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা যায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত বিশেষ বেঞ্চ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং বহু প্রতীক্ষিত ‘দৃশ্যমান বিচার’-এর প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।

রাজন-রাকিবের মতো রামিসার বিচারও কি হারিয়ে যাবে উচ্চ আদালতে!