রংপুরে শিক্ষকসহ পরিবারের ৪ জন হত্যা: থানা থেকে ডিবিতে তদন্তভার
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তভার বদলেছে। কোতয়ালী থানা থেকে মামলাটি এখন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে।পুলিশ বলছে, মামলাটি আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত এবং দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। এরই মধ্যে দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তদন্তের নতুন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে।সোমবার (২৪ আগস্ট) মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জী প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ওসি জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন।নথিপত্র হস্তান্তরের পর পুরনো ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তাই নগরীর মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বাড়িতে যান।সেখানে আগের তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয় নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে বুঝিয়ে দেন। তদন্তের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী তদন্তভার পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।ডিবির উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, রোববার (২৩ আগস্ট) গভীর রাত পর্যন্ত দুই অভিযুক্ত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।পুলিশের দাবি, আদালতে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে এর আগে পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য জানানো হয়েছিল, তার মিল রয়েছে। তবে আসামিরা কিছু অতিরিক্ত তথ্যও জানিয়েছেন, যা তদন্তকারীদের আগে জানানো হয়নি।তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আদালতে দেওয়া জবানবন্দি থাকলেও অন্যান্য সাক্ষ্য, আলামত ও তদন্তের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়গুলো যাচাই করা হবে।গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।এর আগে রোববার ভোরে এ ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ডিআইজি আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।তবে মামলার তদন্ত এখন ডিবির হাতে যাওয়ায় ঘটনার পেছনে আসলে কী ঘটেছিল, তা তদন্তে আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করছে পুলিশ।গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান।নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকার পর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়িটির নিচতলার কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও পরিবার নিয়ে প্রায় দুই-তিন বছর ধরে ওপরের তলায় বসবাস করছিলেন।অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন বলে জানা গেছে।গুরুত্বপূর্ণ দিক
শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলার তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে ডিবিতে দেওয়া হয়েছে।
দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের নতুন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবির ওসি জিন্নাত আলী।একটি পরিবারের চার সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তের প্রতিটি তথ্য যাচাই করা জরুরি। তদন্তভার ডিবিতে যাওয়ার ফলে মামলাটির আলামত, আসামিদের বক্তব্য, পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং সম্ভাব্য অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।তবে এখনই কোনো একটি বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া প্রাথমিক তথ্য, আসামিদের আদালতের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার পরই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: এই মামলায় তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে শুধু ‘কেন হত্যা করা হয়েছে’ তা নয়, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি এবং ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে তাদের বক্তব্য কতটা মেলে—এটি যাচাই করা। ডিবির তদন্তে এই জায়গাটি পরিষ্কার হলে মামলার প্রকৃত ঘটনা বোঝা সহজ হতে পারে।
এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ও গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু তদন্তাধীন মামলায় পুলিশ বা আদালতে যাচাই না হওয়া তথ্য প্রচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রকাশ করাই গুরুত্বপূর্ণ।