যশোর সীমান্তে প্রায় ৮ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালানি পণ্য জব্দ, আটক এক ব্যক্তি
যশোরের কাশিপুর সীমান্তে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এক যৌথ অভিযানে নেশাজাতীয় কফ সিরাপসহ এক ব্যক্তিকে আটক করেছে বিজিবি ও র্যাব। একই দিনে সীমান্তের আরও কয়েকটি পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক, বিদেশি পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।মঙ্গলবার (১৯ মে) যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি) ও র্যাব-৬ এর সদস্যরা শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্ত এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করেন। সীমান্তজুড়ে চলমান মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।গোপিনাথপুর থেকে আটক ইকবালবিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কাশিপুর সীমান্তের গোপিনাথপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন (৪০) নামে একজনকে আটক করা হয়। তিনি মৃত আবুল হোসেনের ছেলে এবং শার্শা উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা।অভিযানে তার কাছ থেকে ৭৮ বোতল উইনসেরেক্স (WINCEREX) এবং ২৬ বোতল এসকাফ (ESCUF) সিরাপ উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এসব সিরাপ নেশার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।আটক ব্যক্তিকে উদ্ধারকৃত আলামতসহ শার্শা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।একই দিনে আরও বড় চালান জব্দকাশিপুরে অভিযান শেষ হওয়ার পর বেনাপোল বিওপি ও বেনাপোল আইসিপির সদস্যরাও সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয় আরও ২০০ বোতল উইনসেরেক্স এবং ১৫২ বোতল এসকাফ সিরাপ।এর পাশাপাশি শাড়ি, থ্রি-পিস, কম্বল, চকলেট, জিরা, ফুসকা, সন পাপড়ি, কিসমিস, আমের চাটনি, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য এবং বিপুল পরিমাণ প্রসাধনী সামগ্রী জব্দ করা হয়।বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এসব মালামালের মোট বাজারমূল্য ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৯০ টাকা।সীমান্তে কীভাবে চলছে এই চোরাপথ?বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই ছোট ছোট চালানে মাদক ও চোরাচালানি পণ্য আনার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় সীমান্তবর্তী এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, রাতের অন্ধকার এবং স্থানীয় দালালচক্রের সহায়তায় এসব পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে যায়।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কফ সিরাপের মতো নেশাজাতীয় দ্রব্য তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের সিরাপ সহজে বহন করা যায় এবং বাজারে এর চাহিদাও থাকায় পাচারকারীরা এটিকে তুলনামূলক নিরাপদ পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।তরুণ সমাজের জন্য বাড়ছে নীরব হুমকিমাদকদ্রব্যের মধ্যে কফ সিরাপকে অনেকেই ‘কম ঝুঁকির নেশা’ বলে ভুলভাবে ধরে নেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সেবনে এটি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং পারিবারিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত দিয়ে এ ধরনের মাদক প্রবেশ অব্যাহত থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজকেও সচেতন ভূমিকা নিতে হবে।বিজিবির বার্তা: অভিযান চলবেযশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান, পিএসসি বলেন, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ পণ্য জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সীমান্তে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।প্রশাসনের অবস্থান ও জনসাধারণের প্রত্যাশাসীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের অনেকেই মনে করেন, নিয়মিত অভিযান চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বড় চক্রের সদস্যরা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায় এবং কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকরা ধরা পড়ে।এই কারণে তদন্তের মাধ্যমে কারা এ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, তা শনাক্ত করার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযান?এক দিনে বিপুল পরিমাণ মাদক ও বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য জব্দ হওয়া প্রমাণ করে সীমান্তপথ এখনো পাচারকারীদের কাছে সক্রিয় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান দেখাচ্ছে, নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আটক ও জব্দ নয়—পেছনের অর্থদাতা, সরবরাহকারী এবং বাজারজাতকারীদের শনাক্ত করা গেলে মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ফল আসতে পারে। সীমান্তে এ ধরনের অভিযান তাই শুধু আইন প্রয়োগের খবর নয়; এটি জননিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াইও বটে।