নতুন রূপে ফিরছে প্যাকেজ ভ্যাট, অনলাইনে মিলবে তাৎক্ষণিক বিআইএন
ব্যবসা সহজ করতে আবারও সীমিত পরিসরে চালু হতে যাচ্ছে প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ এই সুবিধা রাখার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে অনলাইনে তাৎক্ষণিক ভ্যাট নিবন্ধন বা বিআইএন নেওয়ার সুযোগ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে কিছু খাতে ভ্যাট ছাড় বাড়লেও বাড়তে পারে বাড়ি নির্মাণ ও ফটোস্টুডিও খরচ। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে নতুন করে ভ্যাট অব্যাহতির চিন্তা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।নতুন করে আলোচনায় প্যাকেজ ভ্যাট২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর আগের প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। সে সময় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করে আন্দোলনও করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, নতুন পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।[TECHTARANGA-POST:1194]বর্তমানে সেই ব্যবস্থার একটি পরিবর্তিত সংস্করণ ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা এটিকে সরাসরি “প্যাকেজ ভ্যাট” বলতে চাইছেন না। তাদের দাবি, এটি মূলত নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ।সূত্র জানায়, ভ্যাট কমিশনারেটের অধীন প্রতিটি সার্কেলে নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত কাঠামোয় সহজ পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করা হতে পারে। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাথমিক চাপ কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ঘরে বসেই মিলবে বিআইএনবর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) নিতে ব্যবসায়ীদের আবেদন করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তির অভিযোগও রয়েছে।আগামী অর্থবছর থেকে এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায়ী চাইলে ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিআইএন নিতে পারবেন। আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনের মতোই এটি সহজ করার চেষ্টা চলছে।এছাড়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করার চিন্তাও রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় ভ্যাট নিবন্ধন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যবসা সহজ করা এবং কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল কাঠামোয় আনতেই এই পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, “নতুন উদ্যোক্তারা যেন শুরুতেই জটিলতায় না পড়েন, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”চিকিৎসা খাতে স্বস্তি, বাড়তে পারে অন্য খরচআগামী বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হার্টের রিং এবং ডায়ালাইসিসের টিউব। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1160]বর্তমানে হৃদরোগ ও কিডনি রোগের চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব পণ্যে ভ্যাট ছাড় সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।তবে সব খাতে একই চিত্র নয়। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রডের ওপর ভ্যাট কিছুটা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাড়ি নির্মাণ ব্যয় বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।একই সঙ্গে ফটোস্টুডিও খাতেও ভ্যাটের হার বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। ফলে ছবি তোলা বা স্টুডিওসংশ্লিষ্ট সেবার খরচ বাড়তে পারে।ঝুট ব্যবসায়ীদের জন্য আসতে পারে ছাড়তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে জড়িত ঝুট ব্যবসায়ীদের জন্যও বাজেটে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। বর্তমানে জোগানদার হিসেবে তাদের ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা।এবার সেই খাতে ভ্যাট অব্যাহতির পরিকল্পনা করছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এতে খরচ কমবে এবং ছোট উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।তবে তামাক খাতে বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে কী প্রয়োজনবিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ভ্যাট কমানো বা বাড়ানোই মূল সমাধান নয়। তার মতে, দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।তিনি বলেছেন, বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থায় নানা স্তর, ভিন্ন হার এবং জটিলতা রয়েছে। ধীরে ধীরে একটি মানসম্মত বা স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাট হারের দিকে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।তার ভাষায়, “প্যাকেজ ভ্যাট বা বিচ্ছিন্নভাবে ভ্যাট বাড়ানো-কমানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বড় রাজস্ব আহরণ করতে হলে পুরো ব্যবস্থায় সংস্কার দরকার।”তিনি আরও বলেন, ভ্যাট রিফান্ড ও ইনপুট ক্রেডিট ব্যবস্থাতেও নানা জটিলতা রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।আইএমএফের আপত্তির মধ্যেও নতুন পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর অব্যাহতি কমানোর পক্ষে অবস্থান নিলেও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার পথেই হাঁটছে।[TECHTARANGA-POST:1194]বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য কিছু খাতে ভ্যাট হার বাড়ানোর উদ্যোগও রাখা হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন একদিকে রাজস্ব বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপও কম রাখতে চাইছে। ফলে বাজেটে ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নিএনবিআর সূত্র জানিয়েছে, নতুন ভ্যাট ব্যবস্থা, বিআইএন সহজীকরণ, ভ্যাট অব্যাহতি এবং বিভিন্ন খাতে ভ্যাট সমন্বয়সহ প্রায় ১০টি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরই বিষয়গুলো চূড়ান্ত আকার পাবে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে আগামী বাজেটে ভ্যাট কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়নের ওপর।