রোহিঙ্গা সংকট এখন জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি, জাতিসংঘের আরও জোরালো সহায়তা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রোহিঙ্গা সংকট এখন নিরাপত্তা উদ্বেগ, বাড়ছে আন্তর্জাতিক সহায়তার চাপবাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা সামনে আনলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের আরও শক্ত অবস্থান ও কার্যকর সহায়তা চেয়েছেন।[TECHTARANGA-POST:1480]শনিবার সচিবালয়ে বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনাইক–এর সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা ইস্যু, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ নানা বিষয় উঠে আসে।‘মানবিক সংকট’ থেকে ‘নিরাপত্তা সংকটে’ রূপ নিচ্ছে পরিস্থিতিবৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সবসময় শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনে বিশ্বাস করে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এখন দেশের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, এই সংকট বর্তমানে “জটিল ও স্পর্শকাতর” পর্যায়ে পৌঁছেছে।তিনি মনে করেন, শুধু সীমান্ত এলাকায় নয়, দেশের ভেতরেও এর সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রভাব বাড়ছে। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেননি, তবে বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অপরাধ, মাদক চোরাচালান, সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং মানবপাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণেই বিষয়টি এখন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছেও বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।মন্ত্রী বলেন, শুরু থেকেই জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন আরও বড় পরিসরে বৈশ্বিক সহায়তা প্রয়োজন।তহবিল কমছে, চাপ বাড়ছেবাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চলছে। কিন্তু সরকারের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় এই সহায়তা অনেক কম।বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মনোযোগও কিছুটা কমেছে। কয়েক বছর আগে যে পরিমাণ অর্থ ও সহায়তা পাওয়া যেত, এখন তা কমে এসেছে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে কক্সবাজারসহ আশ্রয়শিবির এলাকায় খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের ছায়াতলে আরও শক্ত আন্তর্জাতিক তহবিল ও কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এত বিশাল জনগোষ্ঠীর দায়ভার দীর্ঘ সময় ধরে একা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন হয়ে যাচ্ছে।জাতিসংঘও বুঝছে বাংলাদেশের চাপবৈঠকে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনাইক বাংলাদেশের ভূমিকাকে “মানবিক দৃষ্টান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে সহায়তা চালিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়।তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, এই সংকটের পুরো বোঝা বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা বাস্তবসম্মত নয়।[TECHTARANGA-POST:1436]কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতিসংঘের এই বক্তব্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানকেই আরও জোরালো করেছে। কারণ ঢাকা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসাবৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে সম্মান অর্জন করেছে।তিনি জানান, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরাও বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি শুধু কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়ায় না, একই সঙ্গে এটি দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতারও একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।নির্বাচন, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতাবৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনে জাতিসংঘের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।একই সঙ্গে এসডিজি বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জাতিসংঘের সহযোগিতা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীও বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে জাতিসংঘের অংশীদারত্ব অব্যাহত থাকবে বলে জানান।কেন বাড়ছে উদ্বেগ?নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শরণার্থী সংকট চলতে থাকলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পড়া স্বাভাবিক। কর্মসংস্থান, বনভূমি, স্থানীয় বাজারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়।এ ছাড়া হতাশা, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি বন্দি জীবনের মতো পরিস্থিতি শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও মানসিক চাপ বাড়ায়। আর সেই সুযোগে অপরাধচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। যদিও সব রোহিঙ্গাকে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই, তবু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1436]বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সম্ভব। যতদিন সেটি না হচ্ছে, ততদিন বাংলাদেশকে মানবিকতা ও নিরাপত্তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে হবে।
বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীকে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের জন্য স্বাগত জানান। এ সময় দুই পক্ষই ভবিষ্যতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।