দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ইইউ: মাইকেল মিলার

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশ উত্তরণের পরও দেশটির পাশে থাকতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর একটি অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।মাইকেল মিলারের বক্তব্যে শুধু বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাই নয়, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ককে আরও বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে নেওয়ার ইঙ্গিতও উঠে এসেছে।মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশকে এখন আর শুধু সহায়তা গ্রহণকারী দেশ হিসেবে দেখে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দুই পক্ষের মধ্যে আরও বড় পরিসরে পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে কাজ করছে। ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপের বাজারে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পেয়েছে।এখন এলডিসি উত্তরণের পর সেই সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন ইইউর প্রতিনিধি। সম্ভাব্য এফটিএ সেই নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।তবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও এর আগে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন মাইকেল মিলার।তিনি বলেন, এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবসার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা জরুরি।অর্থাৎ শুধু শুল্ক কমানো বা বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করলেই হবে না। বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি কোম্পানির জন্য নীতিগত সমতা, স্বচ্ছ নিয়ম এবং পূর্বানুমানযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।এফটিএ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।আইনের শাসন, শ্রমিকের অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দেন।এতে বোঝা যায়, ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানি বা শুল্ক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যবসার পরিবেশ, শ্রমমান, পরিবেশগত মান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন মাইকেল মিলার। তাঁর মতে, অর্থনীতিতেও বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের মান উন্নত করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি হবে।রাষ্ট্রদূত দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সবুজ অর্থনীতি, নতুন রপ্তানি বাজার এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোকে বাংলাদেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি, উন্নত মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও উদ্ভাবন নিয়ে আসার আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন মাইকেল মিলার।তাঁর মতে, বাংলাদেশের জনশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও ইউরোপের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবে বাড়লে শুধু রপ্তানি নয়, উৎপাদন প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হতে পারে।এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাবে। বর্তমানে পাওয়া কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে গেলে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।সেক্ষেত্রে একটি কার্যকর এফটিএ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ইউরোপীয় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, শ্রমবাজার ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ স্লোগানে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের আয়োজন করেছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।শনিবার সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নিচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতারাও এতে অংশ নিচ্ছেন। সোমবার সম্মেলনের পর্দা নামার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ইইউ: মাইকেল মিলার