শেবাচিম হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা: হামে ২৬ শিশুর মৃত্যু, চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে ক্ষোভ
সেবা নয়, আতঙ্কের নাম শেবাচিম? শিশু মৃত্যু, মারধর আর অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভে ফুঁসছে বরিশালবরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের জায়গায়। একের পর এক শিশুমৃত্যু, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। সর্বশেষ এক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দুই স্বজনকে মারধর করে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ ওঠার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি এই হাসপাতাল।একদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের উপচে পড়া ভিড়, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা—এই দুইয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালটির ভেতরের সংকট এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা।[TECHTARANGA-POST:1427]২৪ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি ২০০ শিশুশেবাচিম হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিত্র এখন ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন রোগীর স্বজনেরা। হাসপাতাল সূত্র বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে মাত্র ২৪টি। অথচ প্রতিদিন সেখানে ভর্তি থাকছে প্রায় ২০০ শিশু। জায়গা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে হাম ও এর উপসর্গে মারা গেছে ৩৬ শিশু। এর মধ্যে শুধু শেবাচিম হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর। গত বুধবারও মারা গেছে আরও দুই শিশু।চলতি বছরে বরিশাল বিভাগে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৭১২ জন। এর মধ্যে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি ছিল ২ হাজার ৩৪১ শিশু।স্বজনদের অভিযোগ, অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসকেরা অনেক সময় রোগীদের ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন না। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত জনবল ও অবকাঠামো নিয়েই তারা কাজ করছে।“কল দিয়ে পা ধরেছি, তারপরও আসেননি”হাসপাতালটির পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি হয়েছে শেবাচিমেরই চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ইশতিয়াক আহমেদ রিফাতের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে। নিজের ২১ দিনের সন্তান হারানোর পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।তিনি অভিযোগ করেন, শিশুবিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক আশীষ হালদারকে বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি দেখতে আসেননি। পোস্টে তিনি লেখেন, “কল দিয়ে ডা. আশীষ স্যারের পা ধরছি, তারপরও তিনি আসেননি।”আরও লেখেন, “একটু মানুষ হোন, স্যার। প্লিজ।”একজন চিকিৎসকের এমন প্রকাশ্য অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, একজন চিকিৎসক যদি নিজের সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে অসহায় বোধ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা কঠিন হতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।তবে অভিযুক্ত চিকিৎসকের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে মারধরের অভিযোগগত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বানারীপাড়া উপজেলার উজ্জ্বল দের সাত দিন বয়সী মেয়েশিশুর মৃত্যু হয় শেবাচিম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। পরিবারটির অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।এ অভিযোগ ঘিরে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে শিশুর স্বজনদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে কয়েকজন মেডিকেল শিক্ষার্থী এসে দুই স্বজনকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁদের লাশসহ প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রাখা হয় বলেও দাবি পরিবারের।পরে রাত ১টার দিকে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।[TECHTARANGA-POST:1387]এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতালের ভেতরে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি কোথায়? রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।“শিশুরা বাসায় বসেও মরতে পারে”হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীরের বক্তব্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “শেবাচিম হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী মারা যেতেই পারে। শিশুরা তো বাসায় বসেও মরতে পারে।”তিনি আরও বলেন, হাম পরিস্থিতি তিনি সরাসরি দেখছেন না। মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি তো ঘটনাস্থলেই ছিলাম। হস্তক্ষেপ না করলে তো হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যেত। এর আর কী তদন্ত করব?”পরিচালকের এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে এমন মন্তব্য সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।দুই বছর নেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটিশেবাচিম হাসপাতালের আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত দুই বছর ধরে হাসপাতালটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে।সবশেষ ২০২৪ সালে তৎকালীন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম এই কমিটির সভাপতি ছিলেন। এরপর আর কার্যকর কোনো কমিটি গঠন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা মনে করছেন, তদারকি না থাকায় হাসপাতালের ভেতরে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল নগর কমিটির সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী আর উপদেষ্টারা আসেন, ঘুরে যান। কিন্তু শিশুদের অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা স্বজনদের মারধরের ঘটনা কি তাঁদের চোখে পড়ে না?”কেন বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না চিকিৎসক, নার্স কিংবা অবকাঠামো। ফলে একদিকে চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকছেন, অন্যদিকে রোগীর স্বজনেরা প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু বরিশালের নয়; দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেই একই ধরনের সংকট রয়েছে। তবে শিশুস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু না হওয়ায় বরিশালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, বরিশাল শিশু হাসপাতাল দীর্ঘদিন চালু না হওয়া সরকারের বড় ব্যর্থতা। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যকর্মী ও অবকাঠামো বাড়ানো গেলে হাসপাতালের ভেতরে এমন সংঘাত অনেকটাই কমে আসত।তিনি জানান, হামে শিশু মৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার নগরীতে প্রতিবাদ মিছিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1332]সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাইদক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের শেষ ভরসা শেবাচিম হাসপাতাল। কিন্তু সেই হাসপাতাল নিয়েই এখন ভয় আর অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে আসা পরিবারগুলো এখন শুধু চিকিৎসা নয়, নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকছেন।
শিশুমৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। একই সঙ্গে দ্রুত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, শিশু হাসপাতাল চালু এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরির দাবিও উঠছে জোরালোভাবে।