ঈদ সামনে, চাঁদাবাজি ঠেকাতে কড়া অবস্থানে সরকার; পশুর হাটে থাকবে বিশেষ নজরদারি
আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা মাথায় রেখে এবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সরকার। কোরবানির পশুর হাটগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে আনসার সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ মনিটরিং সেলও চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগ জানাতে চালু রাখা হয়েছে বিশেষ হটলাইন নম্বর ১৬৬১১৩।মঙ্গলবার ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে কোথাও যেন জোরপূর্বক টাকা আদায়, দখল বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগে থেকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।পশুর হাটে বাড়ছে নিরাপত্তা ব্যবস্থাস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাটগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্ধারিত পশুর হাটগুলোতে আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মাধ্যমে হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর চেষ্টা করা হবে।[TECHTARANGA-POST:1219]সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১টি পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি চলছে। এসব হাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, টাকা লেনদেনের নিরাপত্তা এবং রাতের পাহারার বিষয়েও আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় পশুর হাটকে ঘিরে চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত ইজারা আদায়, ট্রাক থেকে জোর করে টাকা নেওয়া কিংবা দখল নিয়ে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। এবারও এমন কিছু তথ্য সরকারের কাছে এসেছে বলে ইঙ্গিত দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সংগঠনের নাম উল্লেখ করেননি।‘মানুষের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে’বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ঈদকে ঘিরে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে মানুষের চলাচল বাড়ে, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। এ সময় ছিনতাই, ডাকাতি বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বাড়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে মাঠে সক্রিয় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।তিনি আরও জানান, ঈদুল আজহার আগের সাতদিন এবং পরের সাতদিন পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ মনিটরিং সেল চালু থাকবে। এই সেল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।চাঁদাবাজি বা হয়রানির শিকার হলে সাধারণ মানুষকে ১৬৬১১৩ নম্বরে ফোন করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।চামড়া সংরক্ষণে লবণ দেবে সরকারঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ। প্রতিবছর যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলো।[TECHTARANGA-POST:1195]এবার সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, চামড়া সংরক্ষণের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহ করা হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে চামড়া নষ্ট কম হয়।চামড়া ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে তারা মনে করছেন, শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে তদারকিও জরুরি।গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও আলোচনাঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধে সম্মতি দিয়েছে।ঈদ সামনে রেখে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বা আন্দোলন যেন না তৈরি হয়, সে বিষয়েও সরকার নজর রাখছে বলে জানান তিনি। কারণ অতীতে বেতন-বোনাস নিয়ে জটিলতার কারণে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ও শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।শ্রমিক নেতাদের একাংশ বলছেন, ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ের আগমুহূর্ত পর্যন্ত শ্রমিকরা অনিশ্চয়তায় থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।ঈদকে ঘিরে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপবিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। পশুর হাট, পরিবহন, চামড়া ব্যবসা, পোশাক খাত—সব মিলিয়ে বিপুল অর্থ লেনদেন হয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। এই সময় চাঁদাবাজি বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুরো বাজার ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় পশুর হাটে অতিরিক্ত টাকা আদায় বা পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে কোরবানির পশুর দামে। ফলে শেষ পর্যন্ত ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ ক্রেতারাই।[TECHTARANGA-POST:1186]অন্যদিকে নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে আস্থা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অনেকেই বলছেন, শুধু নির্দেশনা নয়, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।এখন নজর বাস্তবায়নের দিকেঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে পশুর হাট ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়ে একাধিক আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন সবার নজর বাস্তবায়নের দিকে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ঈদকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের ভোগান্তি, জোরপূর্বক টাকা আদায় বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর হয়, সেটিই আগামী কয়েক সপ্তাহে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।