জাবিতে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় উত্তেজনা, অবরোধ তুলে দিয়ে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম শিক্ষার্থীদের
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনার পর প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ান।রোববার (১৭ মে) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাপ্রবাহে পুরো ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।প্রশাসনিক ভবনে তালা, কার্যত অচল হয়ে পড়ে ক্যাম্পাসদিনের শুরুতেই সকাল ১১টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ ছিল, ঘটনার পর যথাযথ অগ্রগতি না থাকায় প্রশাসন দায়িত্বশীল ভূমিকা নিচ্ছে না।[TECHTARANGA-POST:1349]এই সময় প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েন। প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্যাম্পাসজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস ও অফিস কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে।শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, ঘটনাটির দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযুক্তকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে অবরোধ প্রত্যাহারদীর্ঘ সময় ধরে চলা উত্তেজনার পর রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আলোচনা শেষে তারা প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন এবং অবরোধ প্রত্যাহার করেন।তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, আন্দোলন এখানেই শেষ নয়।অর্থনীতি বিভাগের ৫২ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজিহা নাওয়ার বলেন, শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে কিছু দাবি দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য। সেই অনুযায়ী প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই না আন্দোলন দীর্ঘায়িত হোক, কিন্তু ন্যায্য বিচার নিশ্চিত না হলে আমরা আবারও কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হব।”ইতিহাস বিভাগের ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, প্রশাসনিক ভবন অবরোধের মূল উদ্দেশ্য ছিল উপাচার্যের কাছ থেকে ঘটনার অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া। আলোচনা শেষে তারা সন্তুষ্টির কিছু ইঙ্গিত পেলেও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ফলাফল না এলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।উপাচার্যের বক্তব্য ও প্রশাসনের অবস্থানআন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর সঙ্গে তিনি নীতিগতভাবে একমত। তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে তদন্ত কমিটির এখতিয়ারভুক্ত।তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে এবং ঘটনাটির তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1296]তবে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, শুধু আশ্বাস নয়—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি জরুরি।ঘটনার পটভূমি: জঙ্গলে টেনে নেওয়ার অভিযোগঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত মঙ্গলবার (সময়: রাত সাড়ে ১১টার দিকে)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে পাশের জঙ্গলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি দ্রুত ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরদিনই প্রশাসন আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।তবে ঘটনার পর কয়েকদিন পার হলেও অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন শুরু হয়।শিক্ষার্থীদের দাবি ও ছয় দফা অবস্থানআন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে—ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তের শনাক্তকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ।তাদের মতে, ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো ছয় দফা দাবির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়নি।সামাজিক প্রভাব: নিরাপত্তা প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগএই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে রাতের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে।[TECHTARANGA-POST:1302]বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং শিক্ষাঙ্গনে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা টহল, সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা না থাকলে এমন অভিযোগ বারবার সামনে আসতে পারে।অন্যদিকে, প্রশাসনের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—শিক্ষার্থীদের আস্থা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ রাখা।বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ দিকবর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে নতুন কর্মসূচি আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।অন্যদিকে প্রশাসন তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেও এখনো ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে পুরো পরিস্থিতি এখন একটি অপেক্ষার মধ্যে রয়েছে।উপসংহার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিলো ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যেমন দ্রুত বিচার ও জবাবদিহি চাইছেন, তেমনি প্রশাসনও তদন্তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা তাই এই ঘটনার পরবর্তী মোড় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।