হুথিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের প্রস্তুতি সৌদি আরবের, পাশে তুরস্ক-পাকিস্তান
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব—এমন তথ্য উঠে এসেছে রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে। বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া থেকে শুরু করে ইয়েমেনের একাধিক গভর্নরেটে একযোগে হামলা—দুটি সম্ভাব্য কৌশল বিবেচনা করছে রিয়াদ।সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ছয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। তবে এর নির্দিষ্ট সময় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য অভিযানে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থলযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং সৌদি বিমানবাহিনী তাদের আকাশপথে সহায়তা করতে পারে।বাব এল-মান্দেব ঘিরেই মূল লক্ষ্যসৌদি পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই জলপথ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সামনে দুটি সামরিক বিকল্প রয়েছে। প্রথমটি হলো বাব এল-মান্দেব ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় সীমিত অভিযান। দ্বিতীয়টি আরও বড় পরিসরের—ইয়েমেনের আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ কয়েকটি গভর্নরেটে একযোগে হামলা।অভিযানের পরিসর বড় হলে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।তবে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুথি মুখপাত্র কিংবা মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা নিয়ে তাৎক্ষণিক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা, তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামরয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৌদি বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী হলেও রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও সামরিক পরিকল্পনায় মার্কিন সহায়তা থাকার কথাও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনে পাঠিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করতে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টাদের কাজ করার কথাও একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।তবে ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধরত সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত পাকিস্তান নেয়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।সম্ভাব্য অভিযানের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করাও রিয়াদের বড় উদ্বেগ।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের কয়েক হাজার সেনা সৌদি আরবের স্থলসীমান্তের নিরাপত্তা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধে কাজ করছে। তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে তাদের সরাসরি যুদ্ধ করার পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।তুরস্কের তৈরি সৌদি ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী ইয়ানবুর নিরাপত্তায় ফ্রান্সের সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণার কথাও এসেছে।সম্ভাব্য অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পাওয়া বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমন্বয় করেই স্থল অভিযান চালাতে হতে পারে।সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশারের মতে, হুথিদের মতো সংগঠিত বাহিনীকে পিছু হটানোর মতো প্রয়োজনীয় ঐক্য এখনও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে তৈরি হয়নি।গত শীতে আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী পূর্বাঞ্চল দখলের চেষ্টা ও বিচ্ছিন্নতার ডাক দিলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে সরকারপন্থী শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি অবশ্য বলেছেন, এতদিন অবস্থান ধরে রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য; এবার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তার মতে, অভিযানের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় পদাতিক বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ওপর।২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে হুথিদের বিরুদ্ধে সহায়তা দিতে আরব জোটের নেতৃত্বে সামরিক অভিযানে নামে সৌদি আরব। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া অস্ত্রবিরতি পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল করেছিল।কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হুথিদের তৎপরতা আবার বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা রিয়াদের নিরাপত্তা হিসাবকে আরও জটিল করেছে।সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, সম্ভাব্য অভিযান ২০১৫ সালের মতো সর্বাত্মক নাও হতে পারে। তার মতে, আপাতত সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে বাব এল-মান্দেবের আগের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচল স্বাভাবিক রাখা।হুথিরা বর্তমানে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ইয়েমেনে বড় ধরনের সৌদি সামরিক অভিযান শুরু হলে তা শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।বিশেষ করে লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব ও ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযান শুরুর সময় এখনও নিশ্চিত নয়। এটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে, আবার নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও গড়াতে পারে।এই সম্ভাব্য অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু সৌদি আরব কত বড় সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে তা নয়; বরং বাব এল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কতটা বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, সেটিই নজরে রাখার বিষয়।কারণ ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের পাশে থাকা বিভিন্ন দেশের ভূমিকা—সব মিলিয়ে সংঘাতের গতিপথ সহজে অনুমান করা কঠিন। কোনো অভিযান শুরু হলে তার সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি বেসামরিক হতাহত, নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।