ঢামেক মর্গে এক সপ্তাহ ধরে বিকল ফ্রিজার, মেঝেতে রাখা মরদেহে আলামত নষ্ট হওয়ার শঙ্কা
ঢামেক মর্গে সংকট: এক সপ্তাহ ধরে বিকল ফ্রিজার, পচন ধরছে মরদেহ, নষ্ট হওয়ার শঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ আলামতেররাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিকল হয়ে আছে মরদেহ সংরক্ষণের প্রধান কুলার বা ফ্রিজার ইউনিট। ফলে ময়নাতদন্তের জন্য আনা মরদেহগুলো স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, অনেক মরদেহ[TECHTARANGA-POST:1601] মেঝেতে বা ট্রলিতে রাখা হচ্ছে, যার কারণে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মর্গ এলাকায়। একই সঙ্গে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।সোমবার সরেজমিনে মর্গ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফরেনসিক বিভাগের পাশেই স্থাপিত বিশেষ মর্চুয়ারি কুলারটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। একসময় যেখানে একসঙ্গে ৪০টি মরদেহ সংরক্ষণ করা যেত, এখন সেই সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ। ফলে মরদেহগুলো রাখা হচ্ছে বিকল্প ও অস্থায়ী ব্যবস্থায়।মেঝেতে রাখা হচ্ছে মরদেহমর্গ কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য। একটি কক্ষের মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে একাধিক মরদেহ। কয়েকটি মরদেহ রাখা হয়েছে ট্রলির ওপর। কিন্তু কক্ষটিতে নেই পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। গরম আবহাওয়ার কারণে দ্রুত পচন শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।মর্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রামু চন্দ্র দাস জানান, আগে পাঁচটি ছোট ফ্রিজারে মরদেহ সংরক্ষণ করা হতো। তবে সেগুলো অনেক আগেই অচল হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা রেডক্রসের সহায়তায় একটি বড় মর্চুয়ারি কুলার স্থাপন করা হয়। সেটিই ছিল মর্গের প্রধান ভরসা। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সেটিও সম্পূর্ণ বিকল হয়ে রয়েছে।তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় মরদেহগুলো মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। এতে শুধু মরদেহের মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, বরং বিভিন্ন প্রমাণ ও আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।তদন্তের স্বার্থেও বাড়ছে উদ্বেগফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড বা রহস্যজনক ঘটনার ক্ষেত্রে মরদেহের আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে শরীরে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1560]মর্গ সূত্রে জানা গেছে, ঢামেকে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০টি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই মরদেহের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।সংশ্লিষ্টদের দাবি, যদি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের প্রশাসনিক ও মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।দুর্গন্ধে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরাওমর্গের আশপাশে থাকা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এ পরিস্থিতির প্রভাব অনুভব করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পচন ধরা মরদেহ থেকে বের হওয়া তীব্র দুর্গন্ধের কারণে আশপাশের কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে।যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবু মর্গ এলাকার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশগত দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগের বলে মনে করছেন অনেকে।এক সপ্তাহ আগে আবেদন, এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেইফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুলার বিকল হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে লিখিতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনপত্রে মর্চুয়ারি কুলার দ্রুত মেরামতের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই আবেদন ২ জুন জারি করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মরদেহ সংরক্ষণের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কুলারটি দ্রুত সচল করা জরুরি।তবে আবেদন করার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মেরামত কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়নি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।কী বলছে কর্তৃপক্ষ?বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাজহারুল শাহীন বলেন, কুলার বিকল হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।তিনি আশা প্রকাশ করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।[TECHTARANGA-POST:1510]কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সংকট?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রোগীর চিকিৎসা নয়, মৃত্যুর পর মরদেহের যথাযথ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। মর্গের মতো সংবেদনশীল স্থানে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে তা জনস্বাস্থ্য, ফরেনসিক তদন্ত এবং মানবিক মর্যাদা—তিন ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।বিশেষ করে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পুরোনো যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প পরিকল্পনার ঘাটতি প্রায়ই আলোচনায় আসে। ঢামেক মর্গের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজর দ্রুত সমাধানের দিকে। কারণ প্রতিটি মরদেহ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি পরিবারের শেষ স্মৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যও।