দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

মায়ের লাশ দেখতে বাড়ি ফেরার পথে ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল তরুণী রেশমা বেগমের

মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে শেষবারের মতো তাঁর মুখটি দেখার আকুতি নিয়েই গাজীপুর থেকে সাতক্ষীরার পথে রওনা হয়েছিলেন রেশমা বেগম। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল জীবনের শেষ পথচলা। মায়ের কাছে পৌঁছানোর আগেই ফরিদপুরে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী। আহত হয়েছেন তাঁর স্বামী ও মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশুকন্যা। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।[TECHTARANGA-POST:1582]রোববার (৭ জুন) সকাল ৬টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গোন্দারদিয়া এলাকায় মালেকা চক্ষু হাসপাতালের সামনে দুর্ঘটনাটি ঘটে।নিহত রেশমা বেগম সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আব্দুস সাত্তার গাজীর স্ত্রী।শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে নিজেই হয়ে গেলেন বিদায়ের মানুষস্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, মায়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর রেশমা বেগম স্বামী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুর থেকে নিজ গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন। প্রথমে তারা বাসযোগে ফরিদপুরে পৌঁছান। এরপর দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করেন।পরিবারটির লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব সাতক্ষীরায় পৌঁছে মায়ের মরদেহ শেষবারের মতো দেখা। কিন্তু পথের মাঝেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেয়ালে ধাক্কাপুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, গোন্দারদিয়া এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রাইভেট কারটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। দ্রুতগতির গাড়িটি সড়কের পাশে থাকা মালেকা চক্ষু হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীরে সজোরে ধাক্কা দেয়।সংঘর্ষের তীব্রতায় গাড়ির ভেতরে থাকা রেশমা বেগম গুরুতর আহত হন। তাঁর স্বামী ও ছোট্ট কন্যাও আঘাতপ্রাপ্ত হন।[TECHTARANGA-POST:1565]দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মধুখালী ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালান। পরে আহতদের মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রেশমা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন।আহত স্বামী ও শিশুকন্যাকরিমপুর হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজ্জাদ জানান, নিহত রেশমা বেগম মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। দুর্ঘটনায় তাঁর স্বামী ও পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আহত হয়েছেন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর প্রাইভেট কারের চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়নি। চালককে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।যা বলছে পুলিশকরিমপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি জব্দ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।তিনি বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চালকের গাফিলতি, অতিরিক্ত গতি কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1553]কেন বারবার এমন দুর্ঘটনা?বাংলাদেশে মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ যাত্রাপথে ক্লান্ত চালনা, অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের কারিগরি ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব অনেক দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখে।রেশমা বেগমের ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি পরিবারের মুহূর্তেই ভেঙে পড়ার গল্প। একজন মেয়ে মায়ের শেষ বিদায় জানাতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একই পরিবারের দুই প্রজন্মের বিদায়ের শোক একসঙ্গে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে স্বজনদের।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এমন ট্রমা ভবিষ্যতের মানসিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।ফরিদপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সড়কে এক মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো কতগুলো জীবনের গল্প বদলে দিতে পারে। যে যাত্রা ছিল মায়ের শেষ মুখ দেখার, সেটিই হয়ে উঠল রেশমা বেগমের জীবনের শেষ যাত্রা।

মায়ের লাশ দেখতে বাড়ি ফেরার পথে ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল তরুণী রেশমা বেগমের