দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

সড়কে থামছে না মৃত্যু: ১৩ বছরে নিহত ১ লাখ ২৫ হাজার, ঢাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে পথচারীরা

বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং চালক-পথচারীদের অসচেতনতায় দেশের সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, আহত হয়ে অনেকে বরণ করছেন পঙ্গুত্ব। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুর হার বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং আহতের হার বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন।আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। ওই বছর ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন।প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাবে, এসব দুর্ঘটনা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং মোট আহতের ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার, নিরাপদ গতি বজায় রাখা, ট্রাফিক আইন মানা এবং প্রশিক্ষিত চালক নিশ্চিত করা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও বেপরোয়া চালনার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।রাজধানী ঢাকা পথচারীদের জন্য দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে উঠে এসেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছেন।নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৩৪ জন পুরুষ, ২১৯ জন নারী এবং ১৩১ জন শিশু। নিহতদের বড় অংশ ছিলেন পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৯২ জন। দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ৫১৯ জন নিহত হয়েছেন রাতের বেলায়।এই পরিসংখ্যান রাজধানীর সড়কে পথচারীদের নিরাপত্তা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাতের সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে ঢাকার কয়েকটি এলাকাকে বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—যাত্রাবাড়ীডেমরামোহাম্মদপুরকুড়িলবিশ্বরোডএয়ারপোর্ট রোডপ্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় সড়কের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা, ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের মিশ্র চলাচল, ফুটপাত দখল এবং ফুটওভারব্রিজের অবস্থান বা ব্যবহারযোগ্যতার সমস্যা।এ ছাড়া গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ক্লান্ত অবস্থায় দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।ঢাকার সড়কব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোর অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি। এর বিপরীতে ফুটপাত রয়েছে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার।আবার বিদ্যমান ফুটপাতের অনেক অংশ অবৈধ দখল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যবহার করা কঠিন। ফলে অনেক পথচারী মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন, যা তাঁদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলে।বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ট্রাফিক সংকেতের অভাব, নিরাপদ পারাপারের সীমিত সুযোগ এবং ফুটপাতের অনুপযোগিতা পথচারীদের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। সড়ক পারাপারের সময় বাস বা অন্য যানবাহনের ধাক্কায় মৃত্যুর ঘটনাও প্রায়ই ঘটে।২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মীম নিহত হন। পরে ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে সড়ক পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। এসব ঘটনা রাজধানীর সড়কে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দুর্বলতা সামনে এনেছে।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে ঢাকার সড়কে পথচারীদের মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে।প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে দীর্ঘ যানজটের পর সংকেত ছাড়লে যানবাহনের আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। পথচারীদের পারাপারের জন্য আলাদা সংকেত না থাকায় একই সময়ে সড়ক পারাপারের চেষ্টা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।দ্বিতীয়ত, যাত্রী ওঠানো নিয়ে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও রেষারেষির সময় সড়কের পাশে বা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হন।তৃতীয়ত, ফুটপাত চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় পথচারীদের মূল সড়ক ব্যবহার করতে হয়। চতুর্থত, রাতে পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলও প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করে।এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট বা চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার বিষয় সামনে আসে। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার ইতিমধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রণীত খসড়াটির লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরি করা।প্রস্তাবিত আইনে যেসব বিষয় রাখা হয়েছে—সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা।দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া।ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালু করা।পুনরায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখা।গত ১৪ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।তবে খসড়ায় থাকা প্রস্তাবগুলোকে কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচনা করার আগে চূড়ান্ত অনুমোদন ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সারা দেশের ২৭৬ জন দক্ষ ও পেশাদার চালককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর এ সম্মাননা দেওয়া হবে।এর মধ্যে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ২০ জন চালককে এবং প্রতিটি জেলা থেকে চারজন করে চালককে জেলা পর্যায়ে সম্মানিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো, দক্ষ চালকদের উৎসাহিত করা এবং দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি ১২টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবহন খাত সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ও যাত্রী অধিকারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।সড়ক নিরাপত্তা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো।নগর এলাকায় রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক বাসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে সরকারঘোষিত ৬০ ঘণ্টার অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করা।সংস্থাটির মতে, নিরাপদ সড়ক গড়তে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চালকের দক্ষতা, আইনের প্রয়োগ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সড়ক নিরাপত্তায় এক বছরের পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।বুধবার লন্ডন থেকে পাঠানো এক বার্তায় তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব, কাজের সময়সীমা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি স্পষ্ট করতে হবে।তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া কর্মসূচির অগ্রগতি প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা উচিত। কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে—তা দেশবাসীকে জানানো প্রয়োজন।

সড়কে থামছে না মৃত্যু: ১৩ বছরে নিহত ১ লাখ ২৫ হাজার, ঢাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে পথচারীরা