দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

জ্বালানি নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানালেন সেনাপ্রধান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, বাংলাদেশ যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নেয় না—বরং যুদ্ধ যেন এড়ানো যায়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো হয়। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ-এ ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ফেলোদের মাঝে সনদপত্রও বিতরণ করেন তিনি।সেনাপ্রধান বলেন, একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই দেশের অবস্থান তত দৃঢ় হয়। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে যেকোনো সংকট মোকাবিলা করা যায়।বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বড় একটি অংশ সমুদ্রপথে হওয়ায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, সমুদ্রপথ নিরাপদ না থাকলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।একই সঙ্গে তিনি বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন। ✈️সেনাপ্রধান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু একটি মানবিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি দেশের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।পটভূমি হিসেবে উল্লেখযোগ্য, ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে তারা অবস্থান করছে, যা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, দেশে বর্তমানে একমাত্র তেল পরিশোধনাগার হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারি রয়েছে। এর সক্ষমতা দেশের চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে বড় অংশের জ্বালানি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।তিনি বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার হলেও দ্বিতীয় একটি রিফাইনারি গড়ে না ওঠায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের মানুষের ওপর পড়ে।আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি অঞ্চলের পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর।গত ৫ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিন সপ্তাহব্যাপী নিবিড় কৌশলগত নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ হিসেবে ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’ অনুষ্ঠিত হয়। এই কোর্সে মোট ৪৫ জন ফেলো অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য, জ্যেষ্ঠ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কূটনীতিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং করপোরেট নেতারা।পটভূমি হিসেবে জানা যায়, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ মূলত দেশের উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের জন্য কৌশলগত নেতৃত্ব, নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।সমাপনী বক্তব্যে সেনাপ্রধান কোর্স সফলভাবে শেষ করা সব ফেলোকে অভিনন্দন জানান এবং অর্জিত জ্ঞান নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—বাংলাদেশের নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির বিষয় নয়, বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, কূটনীতি ও মানবিক সংকট—সবকিছুর সঙ্গে এটি গভীরভাবে জড়িত। তাই সমন্বিত উদ্যোগই ভবিষ্যতের নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথ দেখাবে। 

জ্বালানি নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানালেন সেনাপ্রধান