বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু হাবিবার সফল অপারেশন, নতুন নাম রাখা হলো ‘জুবাইদা’
বিরল রোগে আক্রান্ত হাবিবার সফল অপারেশন, নতুন নাম রাখা হলো ‘জুবাইদা’জন্মের পর থেকেই মুখ খুলতে পারত না ছোট্ট শিশুটি। মায়ের বুকের দুধও খেতে হতো নাকের নলের মাধ্যমে। একদিকে অসহায় শিশুর কষ্ট, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্ব— সব মিলিয়ে গাজীপুরের একটি পরিবারের জীবনে নেমে এসেছিল চরম অনিশ্চয়তা। তবে শেষ পর্যন্ত সেই অন্ধকারে আলো হয়ে আসে একটি মানবিক উদ্যোগ। সফল অস্ত্রোপচারের পর এখন নতুন জীবন পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে শিশু হাবিবা, যার নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘জুবাইদা’।মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শিশু হাসপাতালে শিশুটির প্রথম ধাপের অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকদের দাবি, এত অল্প বয়সে এমন জটিল অস্ত্রোপচার বাংলাদেশে খুবই বিরল ঘটনা।[TECHTARANGA-POST:1406]জন্মের পরই ধরা পড়ে ভয়াবহ জটিলতাগাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নের বি-কে বাড়ির বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ও দিলরুবা আক্তারের ঘরে গত এপ্রিলে জন্ম নেয় কন্যাশিশু হাবিবা। বিয়ের এক বছর পর প্রথম সন্তানের জন্মে পরিবারে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হলেও খুব দ্রুত সেই আনন্দ দুশ্চিন্তায় বদলে যায়।জন্মের পর চিকিৎসকরা দেখতে পান, শিশুটির দুই মাড়ি ও চোয়াল একসঙ্গে লেগে আছে। ফলে সে স্বাভাবিকভাবে মুখ খুলতে পারছিল না। এমনকি খাবার গ্রহণও ছিল প্রায় অসম্ভব। পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে তার মা সিরিঞ্জের সাহায্যে নাকের নল দিয়ে বুকের দুধ খাওয়াতেন।শিশুটির বাবা একজন পোশাককর্মী হওয়ায় ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও তারা কার্যকর সহায়তা পাচ্ছিলেন না বলে দাবি করেন স্বজনরা।গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বদলে যায় পরিস্থিতিহাবিবার বিরল শারীরিক জটিলতার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি অনেকের নজরে আসে। পরে শিশুটির চিকিৎসায় এগিয়ে আসে ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ)।ফাউন্ডেশনের পরিচালক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহর নেতৃত্বে একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ পর্যালোচনা ও প্রস্তুতির পর মঙ্গলবার অস্ত্রোপচার করা হয়।চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এটি ছিল চিকিৎসার প্রথম ধাপ। শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ হতে ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। তবে বর্তমান অবস্থাকে তারা আশাব্যঞ্জক বলেই মনে করছেন।[TECHTARANGA-POST:1404]অপারেশনের পর নতুন নাম জুবাইদাসফল অস্ত্রোপচারের পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিশুটির মা-বাবা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের ভয় আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে মেয়েকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার সাহস পেয়েছেন তারা।এই আনন্দ থেকেই নিজেদের কন্যাশিশুর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তারা। পরে ডা. জুবাইদা রহমানের নামের সঙ্গে মিল রেখে শিশুটির নতুন নাম রাখা হয় জুবাইদা।শিশুটির মা দিলরুবা আক্তার বলেন, “আমরা ভাবতেই পারিনি এত বড় চিকিৎসা হবে। মেয়েটাকে বাঁচানোর আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আল্লাহ নতুন জীবন দিয়েছেন।”যেভাবে সম্পন্ন হলো জটিল অস্ত্রোপচারচিকিৎসকদের মতে, জন্মগতভাবে চোয়াল ও মাড়ি জোড়া লেগে থাকা অত্যন্ত বিরল শারীরিক সমস্যা। এ ধরনের রোগে আক্রান্ত শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাস, খাবার গ্রহণ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।অপারেশন প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেন জেডআরএফের সদস্য ডা. এমআর হাসান। সার্জারি টিমের নেতৃত্ব দেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন টিম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আকতার হোসেন লোবান অ্যানেসথেসিয়া টিমের নেতৃত্ব দেন।শিশু হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. খালিদ মাহমুদ শাকিল সার্বিক সমন্বয়ে সহায়তা করেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।কেন এমন ঘটনা আলোচনায় আসেচিকিৎসাবিদদের মতে, দেশে বিরল রোগ নিয়ে সচেতনতা এখনো খুব সীমিত। অনেক পরিবার প্রথমদিকে বুঝতেই পারে না শিশুর সমস্যাটি কতটা জটিল। আবার অর্থাভাবে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসাও করাতে পারেন না।বিশেষজ্ঞদের দাবি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরল রোগের জন্য আলাদা সহায়তা কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ না হলে অনেক ঘটনাই আড়ালেই থেকে যায়।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো শুধু আর্থিক সংকটেই পড়ে না, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর কষ্ট দেখা, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা এবং সমাজের নানা প্রশ্ন— সব মিলিয়ে অভিভাবকদের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়।তবে একই সঙ্গে এই ঘটনাগুলো সমাজে মানবিকতার দিকটিও সামনে আনে। অনেক সময় ব্যক্তি উদ্যোগ, সামাজিক সংগঠন কিংবা চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অসম্ভব মনে হওয়া কাজও সম্ভব হয়ে ওঠে।[TECHTARANGA-POST:1405]ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী চিকিৎসকরাচিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অপারেশনের পর এখন থেকে শিশুটি ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে খাবার গ্রহণ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।
শিশুটির বাবা-মা জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এবং চিকিৎসক দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশা ছোট্ট জুবাইদা একদিন অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।